চেম্বারে ঢুকেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন রিনা; তার পেছনে পেছনে ঢুকলেন নাসির ভাই। দুজনের মুখেই আতঙ্ক আর উদ্বেগ।
কাউন্সেলর শারন দ্রুত উঠে এসে রিনাকে বসালেন। একটু শান্ত হওয়ার পর নাসির ভাই কাঁপা গলায় শুরু করলেন, ‘আরোহন, ওর নাইনের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে আগামী সপ্তাহ থেকে। কিন্তু গত রাতে সে মাথা ফাটিয়েছে। কেন এসব হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।’
শারন চিন্তিত হয়ে শুনছিলেন। রিনা আঁচলে চোখ মুছে বলতে শুরু করলেন, ‘গত রাতে যখন ওকে খাবার দিতে যাই, তখন থেকেই গোলমাল। সারা বছর ও বইয়ের ধার দিয়েও যায়নি, সারাদিন ল্যাপটপ, মোবাইল আর অনলাইনে ডুবে ছিল। দুই দিন আগে খুব সিরিয়াস হয়ে পড়ার টেবিল গুছিয়ে বই নিয়ে বসল। দেখে আমি বেশ খুশি হলাম। এই দুই দিন সে ঘরের বাইরে গেল না; কিন্তু বারবার আমাকে বলছে, ওর নাকি কোনো কিছুই মাথায় ঢুকছে না। আসলে সারা বছর পড়ালেখা না করার কারণে ও খুব অস্থির হয়ে বারবার হাহুতাশ করছিল।’
নাসির নিচু করে যোগ করলেন, ‘গতকাল রাতে একটু কড়াভাবেই বলেছিলাম, সারাবছর তো ফোন নিয়ে পড়ে ছিলে, এখন ফল ভোগ করো। ব্যস, অমনি প্রচণ্ড চিৎকারে ঘর মাথায় তুলল; কাচের টেবিল ল্যাম্পটা নিজের মাথায় আঘাত করল; মাথা ফেটে সারা ঘরে রক্ত! আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না কেন সে এমন করছে; শেষে হাসপাতালে নিতে হলো।’
নাসির হতাশ সুরে বললেন, ‘সেলাই আর ব্যান্ডেজ করে বাড়িতে নিয়ে এলাম, কিন্তু ওর মানসিক অবস্থা এখন আরও খারাপ। ঘরের মধ্যে নিজেকে বন্দি করে রেখেছে, কারও সাথে কথা বলছে না। আমরা কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। আরোহন খুবই মেধাবী ছিল, সে কেন এমন হলো? আমরা কি কোনো ভুল করলাম? আমাদের কি কোনো দোষ ছিল?’
শারন নোটপ্যাডটা একপাশে রেখে শান্ত স্বরে বললেন, “নাসির ভাই, রিনা, নিজেদের দোষী ভাববেন না; তবে পরিস্থিতিটা সত্যিই মারাত্মক। এমনটা আজকাল প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। এটা ‘প্রোক্রাস্টিনেশন-অ্যাংজাইটি লুপ’ থেকে সৃষ্টি হয়। এই মুহূর্তে আর কোনো বকাঝকা বা শাসন করবেন না, ওর মানসিক সাপোর্ট এবং আপনাদের পক্ষ থেকে ধৈর্যের খুব বেশি প্রয়োজন।”
এর পর শারন ব্যাখ্যা করলেন কেন এমনটা হয় এবং ডিজিটাল যুগে কেন এমন পরিস্থিতি দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। আসলে আজকের প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীদের মানসিক গঠনে এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক বৃত্ত তৈরি হয়েছে। সারা বছর বইয়ের পাতা এড়িয়ে ল্যাপটপ, মোবাইল বা ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বুঁদ হয়ে থাকার প্রবণতা ঘরে ঘরে এক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন পরীক্ষা কাছে চলে আসে। চোখের সামনে যখন পাহাড়সমান সিলেবাস এসে দাঁড়ায়, তখন অবচেতন মনেই শুরু হয় এক তীব্র যুদ্ধ। সারা বছর পড়াশোনা না করায় এখন সবকিছুই তার কাছে নতুন মনে হয়। মনের মধ্যে নানা অজুহাত সৃষ্টি হয়; মনে হয় সিলেবাসটিই ঠিক নেই, মনে হয় স্কুলে ঠিকমতো পড়ানো হয়নি, কিংবা মনে হয় বাড়ির পরিবেশের কারণেই পড়ালেখা করতে পারেনি। এমন সময় বইয়ের পাতাগুলো যখন অচেনা মনে হয়, তখন অপরাধবোধ আর পরীক্ষার ভীতি একসঙ্গে মিলে কিশোর মনে এমন এক প্যানিক তৈরি করে, যা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
আবার সারা বছর সন্তানের উদাসীনতা দেখে কোনো বাবা-মায়ের পক্ষেই শান্ত থাকা সম্ভব নয়। স্বাভাবিকভাবেই তাদের মাঝেও ক্ষোভ জমে ওঠে। এমন অবস্থায় যখন বাচ্চাটি আগে থেকেই অনুতপ্ত ও দিশাহারা, ঠিক সেই মুহূর্তে মা-বাবার কড়া তিরস্কার, কটুকথা বা তুলনা তার ক্ষতস্থানে নুনের ছিটে দেওয়ার মতো কাজ করে। তারা সন্তানের ভালো চান, কিন্তু সেই কঠোর ভাষা বাচ্চার মনে সাহসের বদলে উল্টো তাকে আরও কোণঠাসা করে দেয়। সে তখন নিজেকে এক চূড়ান্ত ব্যর্থ ও অপ্রয়োজনীয় চরিত্র হিসেবে ভাবতে শুরু করে।
এই তীব্র লজ্জা, ব্যর্থতার আশঙ্কা, বাবা-মায়ের বকুনি কিংবা বাবা-মায়ের প্রত্যাশার সাথে তীব্র গরমিল- এগুলো একসঙ্গে নিজের ভেতরে বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি করে। এগুলো যখন একসঙ্গে একটা কিশোর মনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন সে কোনো কূলকিনারা দেখতে পায় না। চারপাশটা যেন তার কাছে সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে আসে। আবেগের এই চরম বিস্ফোরণে অনেক সময় তারা হঠকারী ও ভয়ংকর কিছু করে ফেলে।
প্যারেন্টিংয়ে কী কী ভুল ছিল?
রিনা ও নাসিরের মতো বাবা-মায়ের কিছু ভুলের কারণেই আরোহনের মতো শিশুরা এমন পরিণতির মধ্যে পড়ে। একটা বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে সব বাবা-মাকে বুঝে নিতে হবে যে, একটা শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে, তখন সে যেন একটা সাদা কাগজের মতো পরিষ্কার। এরপর বাবা-মা সেই সাদা কাগজে শিশুর অভ্যাস তৈরি করেন, অভ্যাসের জন্ম দেন, অভ্যাসের নিয়ন্ত্রণ করেন এবং অভ্যাসগুলোকে মজবুত করেন। তাই শিশুটি আজ যেমন আচরণ করছে, তার প্রায় পুরো দায়ভার বাবা-মায়ের ওপরই থাকে। অবশ্যই সব বাবা-মা তাদের সন্তানদের জন্য সবচেয়ে ভালো করার চেষ্টা করেন, সন্তানকে তারা সুখী দেখতে চান; কিন্তু আজকের যুগে অনেক বাবা-মা জানেন না যে, কোনটি শিশুর জন্য ভালো আর কোনটি শিশুর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
আরোহনের ক্ষেত্রে তার বাবা-মায়ের কিছু সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত ভুল ছিল। প্রথমত, তারা নিজেদের জীবনের পাশাপাশি সন্তানের দৈনন্দিন জীবনেও ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহারের ওপর কোনো সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেননি। শৈশব থেকেই ছেলে ল্যাপটপ ও মোবাইলে অভ্যস্ত হয়ে থাকলেও তারা গুরুত্ব দেননি বা মনিটর করেননি, কিংবা এই বিষয়ে কোনো সচেতনতা সৃষ্টি করেননি। যার ফলে আরোহনের মধ্যে ডিভাইসের পেছনে বেশি সময় দেওয়া এবং পড়ালেখার জন্য কম সময় দেওয়ার অভ্যাস এবং এভাবে ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদে পড়ালেখা পিছিয়ে যাওয়ার বা প্রোক্রাস্টিনেশনের অভ্যাস শেকড় গেড়ে বসেছিল।
দ্বিতীয়ত, শৈশব থেকে সন্তানকে কেবল পরীক্ষার ফলাফল বা নম্বরের মাপকাঠিতে মূল্যায়ন করার যে প্রবণতা আমাদের সমাজে রয়েছে, সেই কারণে আরোহন তার পড়ালেখার ভয় বা ব্যর্থতাগুলো বাবা-মায়ের সাথে খোলামেলাভাবে শেয়ার করার ভরসা পায়নি। বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে যোগাযোগটা হয়ে উঠেছিল একমুখী, যেখানে মেন্টাল সাপোর্টের চেয়ে শাসন ও বকাঝকাই প্রধান হয়ে উঠেছিল। আর অবশ্যই রিনা এবং নাসির ভুলে গিয়েছিলেন টিনএজ বয়সের মানসিক স্বাস্থ্যের ওঠানামার কথা। তারা ভুলে গিয়েছিলেন যে, টিনএজ বয়সটি জীবনের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এই বয়সে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মস্তিষ্কে ব্যাপক পরিবর্তন আসে, যা কিশোর-কিশোরীদের মাঝে আবেগীয় ঢেউ, হঠকারিতা এবং অতিরিক্ত সংবেদনশীলতার জন্য সরাসরি দায়ী। রিনা ও নাসির তাদের সন্তানের এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটি পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিলেন। তারা আরোহনকে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মতো বিচার করতে শুরু করেছিলেন, ভেবেছিলেন সে জেনেশুনেই অবহেলা করছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পড়াশোনা থেকে দূরে থাকছে।
কৈশোরের এই বয়সটিতে একটা ছোট ধাক্কাও অনেক সময় পাহাড়সমান মনে হয়। আরোহন যখন দেখল যে সামনে এক বিপর্যয়, তখন তার মানসিক সহ্যক্ষমতা ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু বাবা-মা হিসেবে রিনা ও নাসির এই ভেতরের কান্নার আওয়াজটা ধরতে পারেননি। তারা সন্তানের আচরণে শুধু ‘অলসতা’ ও ‘দায়িত্বহীনতা’ দেখেছিলেন, কিন্তু তার আড়ালে থাকা তীব্র অপরাধবোধ, হীনমন্যতা এবং অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণে তৈরি হওয়া প্যানিকটাকে একেবারেই বুঝতে পারেননি। ফলে বাচ্চার মনের ভেতর জমে হতে থাকা চাপা অসহায়ত্বকে তারা সাপোর্ট দেওয়ার বদলে কড়া কথা ও তিরস্কারের মাধ্যমে সেটিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। একটি কিশোর যখন ভেতর থেকে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং অনুভব করে যে তাকে বোঝার মতো কেউ নেই, তখন সে চরম একাকিত্ব ও দিশাহারা বোধ করে। এই যোগাযোগের ঘাটতি এবং মানসিক সাপোর্টের প্রতি উদাসীনতাই শেষ পর্যন্ত তাকে মানসিক ইমব্যালেন্সের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
সমাধানের উপায়
আরোহনের মূল সমস্যাটি ছিল প্রোক্রাস্টিনেশন বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস। তাই এমন পরিস্থিতি এড়াতে সন্তানের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই সঠিক কাজ সঠিক সময়ে করার অভ্যাস বা সেল্ফ-রেগুলেশন গড়ে তুলতে হবে। এজন্য বাবা-মা হিসেবে আপনার সন্তানকে শাসনের পরিবর্তে কিছু মনস্তাত্ত্বিক কৌশল অবলম্বন করুন।
প্রথমত, বিশাল সিলেবাস বা যেকোনো বড় কাজের ভীতি দূর করতে ‘মাইক্রো-হ্যাবিট’ বা ছোট ছোট ভাগে কাজ ভাগ করার পদ্ধতি শিখিয়ে দিন। পুরো চ্যাপ্টারের বদলে শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি প্যারাগ্রাফ পড়ার টার্গেট দিন। পড়ালেখাকে আনন্দময় করে তুলুন।
দ্বিতীয়ত, ডিভাইস বা বিনোদনের আকর্ষণকে শত্রু না বানিয়ে বরং সুনির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান তৈরি করে দিন, যেখানে নির্দিষ্ট সময় পড়াশোনা করার পর নির্দিষ্ট সময় স্ক্রিন টাইম বা পছন্দের কাজের সুযোগ থাকবে।
তৃতীয়ত, পরীক্ষার ফলাফল বা নম্বরের ওপর অতিরিক্ত জোর না দিয়ে সন্তানের প্রতিদিনের চেষ্টার প্রশংসা করুন, যাতে সে ব্যর্থতার ভয়ে কাজ জমিয়ে না রাখে। অন্য শিশুদের সাথে তার তুলনা না করে বলুন কীভাবে সে গতকালের চেয়ে আজ আরও একটু ভালো করতে পারে।
চতুর্থত, শৈশব থেকেই ডিভাইসের ব্যবহারের একটি স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দিন; ডিভাইসের ভালো ও মন্দ নিয়ে আলোচনা করুন এবং পড়ার টেবিলে একা ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ না রেখে বসার ঘরের মতো নির্দিষ্ট স্থানে তা রাখুন। আর শিশু কোনো কারণে পিছিয়ে পড়লে তাকে বকাঝকা না করে ঠান্ডা মাথায় তার সমস্যার অংশীদার হন, যেন সে ভয় পাওয়ার বদলে সহযোগিতার মাধ্যমে নিজের ভুল শুধরে নিতে শেখে।
‘তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুকে অবশ্যই সময় দিতে হবে, তার সাথে অনেক গল্প করতে হবে, তাকে স্বপ্ন দেখাতে হবে এবং জীবনলক্ষ্য সৃষ্টি করতে তাকে অনুপ্রাণিত রাখতে হবে। শৈশব থেকেই শিশুর মধ্যে আত্মসম্মানবোধ জাগিয়ে তুলতে পারলে সেটা হবে সবচেয়ে সেরা ব্যবস্থা, আর এমন হলে শিশু নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে দক্ষ হয়ে উঠবে।’
এ ইউ দৌলা……….
লেখক: মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক
