প্রাইভেসি কি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ ?

এ ইউ দৌলা

লন্ডনের একটি চমৎকার অ্যাপার্টমেন্টে একাকী বসবাস করে শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের এক যুবক। সে নিজের জীবনকে নিজের মতো করে উপভোগ করতে পছন্দ করে। প্রাইভেসি রক্ষার ব্যাপারে সে ভীষণ সতর্ক; অন্য কেউ তার ব্যক্তিগত সীমানায় আঘাত করবে, এমন চিন্তাও করতে পারে না। শুধু লন্ডনে কেন বরং পুরো পশ্চিমা সমাজব্যবস্থায় প্রাইভেসি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যক্তিগত অধিকার হিসেবে দেখা হয়ত। সেখানে প্রাইভেসি বলতে বোঝানো হয় নিজের শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক সব স্বাতন্ত্র্যকে আলাদাভাবে রক্ষা করা। তারা তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ইমেইল বা ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে অন্যের নাক গলানো কঠোরভাবে অপছন্দ করে। তাদের কাছে এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সুরক্ষার প্রধান ঢাল।

কিন্তু কেন তাদের সংস্কৃতিতে প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এত বেশি গুরুত্ব পেল? এর মূল কারণ রয়েছে তাদের সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত ‘ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক’ বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সমাজব্যবস্থার মাঝে। সেখানে ছেলেমেয়েরা আঠারো বছর হলেই নিজের মতো করে স্বাধীন জগতে পা বাড়ায়। তাই সামাজিক পরিবেশ ও জীবন কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে, আঠারো বছরের বেশি বয়স হলে ছেলেমেয়েদের দায়দায়িত্ব আর অভিভাবকের ওপর থাকে না; পিতামাতাও চান সন্তানরা নিজেদের মতো করে জীবন খুঁজে নিক।

এমন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সমাজব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষ অত্যন্ত সংগ্রামী হয়ে ওঠে এবং সেই সংগ্রামের একটি বড় কৌশল হলো প্রতিযোগিতা করে এগিয়ে যাওয়া। মানুষ যখন তীব্র প্রতিযোগিতায় নামে, তখন সে নিজের কৌশলগুলো লুকিয়ে রাখতে চায় এবং নিজের দুর্বলতাগুলোকে আড়াল করার তীব্র প্রয়োজন অনুভব করে। তাই যে সমাজব্যবস্থায় বেঁচে থাকা, টিকে থাকা, উন্নতি করা, প্রফিট করা কিংবা নিরাপদ থাকার জন্য ব্যক্তিগত বিষয়গুলোকে লুকিয়ে রাখা দরকারি, সেই প্রয়োজনই ধীরে ধীরে সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।

তাই এটা স্পষ্ট যে, প্রাইভেসির ধারণা আসলে সেই সব সমাজের জন্য যেখানে মানুষ আত্মকেন্দ্রিক, যেখানে পারিপার্শ্বিক নিরাপত্তা কম, যেখানে মানুষেরা অন্যের আবেগ ও সম্মান রক্ষা করতে কম অভ্যস্ত এবং যেখানে মানুষ প্রবলভাবে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে।

এর বিপরীতে এশিয়ার জনবহুল অঞ্চলের কোনো গ্রামীণ জনপদ বা যৌথ পরিবারের চিত্রটি লক্ষ্য করুন। সেখানে মানুষেরা ঘরের দরজা দিনের বেশিরভাগ সময়ই খোলা রাখেন। পাড়ার কেউ হুট করে এসে খোঁজ নেন, কার ঘরে কী রান্না হলো বা কার পরিবারে কী চলছে, তা প্রায় সবারই জানা থাকে। এই সমাজ গুলোতে প্রাইভেসির চাদর গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা সামাজিক ব্যাপারগুলো উন্মুক্ত থাকাটাই বহু পুরনো অভ্যস্ততা। এখানে অন্যের জীবনে কিছুটা প্রবেশ করাকে পারস্পরিক সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ও সামাজিক বন্ধন বলেই মনে করা হয়। এমন সমাজে মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা কম থাকে; এখানে একে অপরের কষ্ট বা দুর্বলতাকে নিয়ে সমালোচনার সংস্কৃতি নয় বরং তারা একে অপরের প্রতি সহমর্মী হয়। তারা একজনের সমস্যাকে সকলের সমস্যা হিসেবে দেখে এবং যে কোন সমস্যায় সংগ্রাম করে দলবদ্ধভাবে। আর ঠিক এ কারণেই এমন সমাজগুলোতে প্রাইভেসির পরিবর্তে একটি সুদৃঢ় ‘সামাজিক শিষ্টাচারের’ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, মানুষের মস্তিষ্ক হলো প্যাটার্ন খোঁজার যন্ত্র। যখন কোনো সমাজ বা পরিবেশ জীবনকে কঠিন করে ফেলে, সামাজিক নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, কিংবা যেখানে অতিরিক্ত বিচার ও সমালোচনার ভয় থাকে, তখন মস্তিষ্কের বিপদের কেন্দ্র বা অ্যামিগডালা অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। মানুষ তখন নিজেকে রক্ষা করতে গোপনীয়তার দেওয়াল বা প্রাইভেসি খুঁজতে বাধ্য হয়। আবার কোন কারণে মানুষের মনে যখন অপরাধবোধ বা সামাজিক অবমূল্যায়নের আতঙ্ক কাজ করে, তখনও সে প্রাইভেসির আড়ালে আশ্রয় নেয়। কিন্তু যদি এমন একটি সমাজব্যবস্থা থাকে যেখানে লুকানোর কিছু নেই, যদি সামাজিক নিরাপত্তা মজবুত হয়, যদি নিজেদের মধ্যে ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতা না থাকে এবং যদি মানুষ নিজের ভুলগুলো সাহসের সাথে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তবে প্রাইভেসির সেই মনস্তাত্ত্বিক চাপ আর থাকে না।

প্রাইভেসি নাকি সামাজিক শিষ্টাচার?
প্রাইভেসি এবং সামাজিক শিষ্টাচারের মাঝে একটি স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মানুষ পোশাক পরে নিজেকে আবৃত করে, ঘরের জানালায় পর্দা ঝোলায় কিংবা প্রাকৃতিক কাজের সময় নিজেকে আড়াল করে; এগুলো সামাজিক শিষ্টাচার, প্রাইভেসি নয়। যেসব বিষয় স্বাভাবিক সত্য, সবাই যা জানে অথচ তা অন্যদের অসুবিধা, কষ্ট কিংবা যেসব কথা বা দৃশ্য অন্যদের শারীরিক বা মানসিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে, সেই স্বাভাবিক বিষয়গুলোকে মানুষ শালীনতার খাতিরে আড়াল করে।
পক্ষান্তরে, প্রাইভেসি হলো এমন এক চাহিদার অনুভব, যা অন্যরা জানলে ব্যক্তির লাভ কমে যেতে পারে কিংবা ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। যেমন ধরুন, আপনি কয়েক কোটি টাকা ব্যাগে নিয়ে ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য রওনা হলেন; এই তথ্যটি ছিনতাইকারীদের কাছে পৌঁছে গেলে তারা আপনার ওপর আক্রমণ করতে পারে। এখানে নিরাপত্তার খাতিরে গোপনীয়তার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কিন্তু এই প্রয়োজনের উদ্ভব হয় মূলত এ কারণে যে, রাষ্ট্র বা সমাজ আপনাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই আপনার মনে সেই আশঙ্কা থাকে। অর্থাৎ, সিস্টেমের দুর্বলতাই ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।
আসলে প্রাইভেসির ধারণাটি একটি কৃত্রিম সীমানা, যা মানুষ অন্য মানুষ বা সমাজের হাত থেকে নিজেকে আড়াল করতে বা বাঁচাতে ব্যবহার করে। কিন্তু এটি প্রায়শই ভীতি, দূরত্ব বা ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়। পক্ষান্তরে, সামাজিক শিষ্টাচার কোনো লুকোচুরি বা দেওয়াল নয়; এটি হলো অকরণীয় বিষয়গুলো বর্জন করার সামাজিক অভ্যাস এবং বাস্তবতাকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের নিয়ম। যেমন, মার্জিত পোশাক পরা, ঘরের ভেতরের দৃশ্য আড়ালে রাখা, অন্যদের অন্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে এমন জৈবিক বিষয়গুলোকে শালীনতার সাথে রক্ষা করা, অন্যের সীমানাকে সম্মান জানানো, পরনিন্দা না করা এবং অন্যের ভুল প্রচার না করা। প্রাইভেসি যেখানে মানুষকে একে অপরের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সামাজিক শিষ্টাচার সেখানে মানুষকে সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে একসাথে বাঁচতে শেখায়।
তাহলে প্রাইভেসিহীন পৃথিবী কেমন হবে?
ধরুন, যদি কাল সকালে পৃথিবী থেকে প্রাইভেসির সমস্ত কৃত্রিম দেওয়াল চিরতরে মুছে যায়, তবে কী হবে?
যাঁদের জীবনে লুকানোর কিছু নেই এবং যাঁরা আত্মবিশ্বাসী, তাঁদের জীবনে তেমন কোনোই প্রভাব পড়বে না। তবে যাঁরা সারাক্ষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, সমালোচনার ভয় পান, তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন, বিস্তর অবৈধ অর্থ জমা করেছেন কিংবা অবৈধ কাজ করেন কিংবা অপরাধবোধের মধ্যে থাকেন, তাঁদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে। তাই সমাজ যদি পরনিন্দা ও কুৎসা রটানোর অসুস্থ সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সামাজিক শিষ্টাচারের ওপর দাঁড়ায়, তবে প্রাইভেসির ধারনা বিহীন সমাজ হবে অনেক বেশি নিরাপদ, সাম্যবাদী, সহানুভূতিপূর্ণ এবং উন্নত।
স্পষ্টভাবেই, প্রাইভেসির প্রয়োজন সবার জন্য সমান নয়। এই জগতে যারা নিজেকে কম নিরাপদ অনুভব করেন, যাঁদের অসৎ উদ্দেশ্য থাকে বা যাঁদের কর্মকাণ্ড অবৈধ, তাঁরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে প্রাইভেসির আড়াল খোঁজেন। পক্ষান্তরে, সৎ, নির্ভীক ও স্বচ্ছ মনের মানুষের জন্য প্রাইভেসি কি সত্যিই খুব বেশি দরকারি?
কেন প্রাইভেসি একটি ‘বাজওয়ার্ড’?
ডিজিটাল যুগে ‘প্রাইভেসি’ কেবল একটি ফ্যাশনেবল শব্দ বা বাজওয়ার্ড ছাড়া আর কিছু নয়। একদিকে প্রযুক্তি জায়ান্ট কিংবা  রাষ্ট্রগুলো ঠিকই সব মানুষের সমস্ত তথ্য নিজেদের কবজায় রাখছে; যেখানে সত্যিকারের প্রাইভেসি বলে আসলে কিছুই নেই; অন্যদিকে সাধারণ মানুষ প্রাইভেসির মিথ্যে মোহে নিজেদের জীবনকে জটিল করে তুলছে।
তাই প্রাইভেসির অলীক ধারণার পেছনে শক্তি ও সময় নষ্ট না করে আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত সামাজিক শিষ্টাচার ও চরিত্রের দৃঢ়তা অর্জনের ওপর। সমাজে যদি নিরাপত্তা থাকে, অবৈধ কর্মকাণ্ড বা কালো টাকা জমা করার প্রবণতা বন্ধ হয়, যদি অন্যের ভুল নিয়ে হাসাহাসি করার বা পরনিন্দা করার সংস্কৃতি দূর হয়, মানুষ যদি একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় এবং আত্মসম্মানের মানসিক শক্তি অর্জন করতে পারে, তবে আলাদা করে প্রাইভেসির প্রয়োজনই হবে না।
কৃত্রিম গোপনীয়তার চেয়ে পারস্পরিক সম্মান, আত্মসম্মান এবং স্বচ্ছ ও নির্ভীক জীবনযাপনই হোক সভ্যতার শিক্ষা ও মানবীয় স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য।
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)