বিড়ালের প্রতি মায়া, কিন্তু মানুষের প্রতি?
তাসফিয়া আফরিন অদ্রি
আমাদের চারপাশটা প্রতিদিনই একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। বদলে যাওয়াই যেন জগতের সবচেয়ে ধ্রুব সত্য। মায়ের মুখে শুনেছি, মাত্র চার দশক আগে আমাদের দেশের অনেক গ্রাম, গঞ্জ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বেশ বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিল। তখন মানুষ নির্বিচারে গাছ কাটত, কিন্তু নতুন করে গাছ লাগানোর প্রয়োজন খুব একটা অনুভব করত না। ফলে অনেক পাহাড় এবং সমতলের এলাকা ধীরে ধীরে প্রায় বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছিল। আবার সেই সময়ে কিছু মানুষ নির্বিচারে পাখি শিকার করত। ফলে বক, ঘুঘু, চড়ুই—এসব সুন্দর পাখি প্রায় দেখাই যেত না। তবে সামাজিক সচেতনতার কারণে গত দুই দশকে সেই দৃশ্যপটে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে।
দেশের অনেক অঞ্চল আগের তুলনায় সবুজ হয়েছে এবং গ্রামের দিকে এখন ঘুঘু, চড়ুই, শালিক, বক, ফিঙেসহ নানা ধরনের পাখি চোখে পড়ে। আরও একটি ব্যাপার হয়েছে; তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিড়াল, কুকুর ও নানা ধরনের পোষা প্রাণী পালনের প্রবণতাও বেড়েছে। বন্যপ্রাণী ও পশুপাখির অধিকার এবং তাদের প্রতি এই প্রজন্মের মমতা, যত্ন, সচেতনতা ও ভালোবাসা নিঃসন্দেহে একটি সুন্দর পরিবর্তন।
কিন্তু এই শখের আনন্দের মাঝেও একটি সূক্ষ্ম ব্যথা প্রায়ই আমার মনে এসে ভিড় করে; একটি বড় দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আমার বাড়ি থেকে কিছু দূরেই একটি বস্তি। সেখানে অনেক শিশু আছে; তাদের চারপাশের পরিবেশ নোংরা, কাদামাখা ও অস্বাস্থ্যকর। রোগব্যাধি, মশা আর দুর্গন্ধের মধ্যে তারা বেড়ে উঠছে। অনেকেরই ভালো খাবার নেই, ভালো পোশাক নেই, নিরাপদ পরিবেশ নেই; নেই সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার প্রয়োজনীয় সুযোগ। তাদের জীবন যেন কোনোভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তাই নিজেকেই প্রশ্ন করি, আমি একটি বিড়ালের জন্য এতটা মমতা অনুভব করি, অথচ আমার আশপাশের ক্ষুধার্ত, অসহায় ও বঞ্চিত শিশুদের জন্য কেন একই ধরনের মায়া অনুভব করি না? একটি প্রাণীর প্রতি আমার এত ভালোবাসা, এত যত্ন, অথচ মানুষের শিশুর ক্ষেত্রে সেই অনুভূতিটি কেন হারিয়ে যায়?
নিজেকেই আবার প্রশ্ন করি, এর কারণ কি এই যে পশুপাখির ভালোবাসাকে আমরা নির্মল বলে অনুভব করি, আর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ককে মনে করি জটিল? তারা জটিল সামাজিক প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের কাছে আসে না; একটি বিড়াল দামি পোশাক চায় না, সামাজিক মর্যাদা চায় না, প্রতিযোগিতা করে না। আমরা তাকে যা দিই, সে তার মধ্যেই সন্তুষ্ট থাকে এবং আমাদের প্রতি মমতা প্রকাশ করে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক অনেক বেশি জটিল। আবার আধুনিক জীবনে সততা, বিশ্বাস ও আস্থার জায়গাগুলো নানা কারণে দুর্বল হয়েছে। ভালোবাসা ও বিশ্বাসের অভিজ্ঞতা এখন প্রায়ই কষ্ট, হতাশা বা মানসিক আঘাতের কারণ হয়েছে। ফলে হয়তো মানুষকে আমরা আর নির্মল সঙ্গী ও নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখতে পারি না। বরং অনেক সময় স্বার্থ, প্রতিযোগিতা, প্রত্যাশা, হিসাব এবং অবিশ্বাসের ভয় দিয়েই মানুষকে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি।
আচ্ছা, এমন যদি হয়—পশুপাখির সুন্দর ভিডিও যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং আমাদের মনে মমতা সৃষ্টি করে, ঠিক একইভাবে যদি বঞ্চিত শিশুদের জীবন, তাদের স্বপ্ন, অধিকার ও সংগ্রামের গল্প দিয়ে হৃদয়স্পর্শী ভিডিও তৈরি করা হয়? যদি শিশুদের অধিকার ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক প্রচার বাড়ানো যায়? যদি একজন অসহায় শিশুর মুখের হাসি, তার স্কুলে যাওয়ার আনন্দ, তার একটি বই পাওয়ার আনন্দও আমাদের কাছে একটি সুন্দর বিড়ালের ভিডিওর মতোই আবেগ তৈরি করতে পারে? তাহলে হয়তো আমাদের সামাজিক সংবেদনশীলতার পরিধিও ধীরে ধীরে বদলাতে পারে।
আমরা একটি পোষা প্রাণীর পেছনে শখ করে হাজার হাজার টাকা খরচ করি। তাকে খাবার দিই, চিকিৎসা করাই, পরিচর্যা করি; এতে কোনো ভুল নেই। বরং একটি প্রাণীর প্রতি মমতা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষের মানবিকতারই একটি সুন্দর প্রকাশ। কিন্তু সেই মমতা যদি মানুষের প্রতিও বিস্তৃত হয়, তবে তার মূল্য আরও গভীর হতে পারে। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যদি বঞ্চিত শিশুদের খাবার, শিক্ষা, বই, পোশাক কিংবা নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য ব্যয় করি, তাহলে হয়তো শুধু একটি শিশুর মুখেই হাসি ফুটবে না, আমাদের নিজেদের মনেও একটি গভীর মানবিক শান্তি তৈরি হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, শহীদ বীর–উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস স্কুল ও কলেজ
