এ ইউ দৌলা
১৯৬৫ সালে যখন সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়া থেকে স্বাধীন হয়ে একটি ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম সংশয় ও হতাশা ছিল। প্রায় শূন্য প্রাকৃতিক সম্পদ, তীব্র দারিদ্র্য, জনঘনত্ব, জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাত এবং সবচেয়ে বড় সমস্যাটি ছিল রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শেকড় গেড়ে বসা সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে পুলিশ বিভাগ, বন্দর থেকে শুরু করে বিচারালয়—কোথাও আইনের শাসন বা সততার লেশমাত্র ছিল না। ঘুষ দেওয়া ছাড়া কোনো ফাইলের একটি পাতাও নড়ত না। বিশ্বের পর্যবেক্ষকরা মনে করতেন, এই রাষ্ট্রটি টিকবেই না; এটি একদিন অপরাধ ও বিশৃঙ্খলার অতলে হারিয়ে যাবে।
কিন্তু আজ সিঙ্গাপুর হয়ে উঠেছে এক অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য রূপান্তরের নাম। আজ সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ এবং উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই রূপান্তরের পেছনে অনেকেই কেবল লি কুয়ান ইউ সরকারের কঠোর আইন, দুর্নীতি দমন ব্যুরো এবং উচ্চ বেতন কাঠামোর কথা বলে থাকেন। কিন্তু এই কাঠামোগত পরিবর্তনের আড়ালে আসলে লুকিয়ে আছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব। সিঙ্গাপুর চোরকে শাস্তি দিয়েছে, পুলিশি পাহারা বাড়িয়েছে; কিন্তু তার চেয়েও বড় এমন কিছু করেছে যা তাদের পুরো জাতির মানসিকতা, সম্মানবোধ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিকে সমূলে পাল্টে দিয়েছে।
সিঙ্গাপুরের জন্মলগ্নে দুর্নীতি হয়ে উঠেছিল সমাজের একটি অবধারিত সংস্কৃতি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ দিকে এবং স্বাধীনতার প্রাথমিক বছরগুলোতে সিঙ্গাপুরের সরকারি কর্মচারীদের বেতন ছিল অত্যন্ত নগণ্য। মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় সেই আয় দিয়ে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল না। এই আর্থিক অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ঘুষ নেওয়া সেখানে একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় বড় কর্তারা সবাই জানতেন, সেবা পেতে হলে ‘চা-পানি’ দিতেই হবে।
যখন সমাজে দুর্নীতি সর্বব্যাপী হয়ে ওঠে, তখন মানুষের ভেতর থেকে আত্মসম্মানবোধ ও নৈতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। মানুষ তখন সৎ থাকাকে বোকামি মনে করে এবং অবৈধ পথকে বেঁচে থাকার কৌশল বলে ধরে নেয়। সিঙ্গাপুরের প্রাথমিক সমাজেও ঠিক এমনই মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয় ঘটেছিল, যেখানে আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের কোনো আস্থা বা সম্মান ছিল না। এই অন্ধকূপ থেকে জাতিকে টেনে তোলার জন্য লি কুয়ান ইউ এবং তাঁর সহযোগীরা এমন এক নীতি গ্রহণ করেছিলেন যা কেবল আইন নয়, বরং তা ছিল সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত বিপ্লব।
লি কুয়ান ইউ বুঝেছিলেন, নিচের কর্মচারীদের দুর্নীতি দমন করতে হলে সবার আগে মাছের মাথা পরিষ্কার করতে হবে, অর্থাৎ রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রশ্নাতীতভাবে সৎ হতে হবে। তিনি এবং তাঁর মন্ত্রীরা নিজেদের জন্য এক কঠোর ও আপসহীন নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন। মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তা সামান্যতম দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও তাঁদের ছাড় দেওয়া হতো না; এর ফলে সেই সময় অনেকেরই রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন চিরতরে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই অনমনীয় ও সৎ নেতৃত্ব জনগণের মনে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল যে আইন সবার জন্য সমান এবং রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সাথে প্রতারণা করছে না।
সিঙ্গাপুরের দুর্নীতি দমন ব্যুরোকে এমন এক স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছিল যে, তারা দেশের যেকোনো প্রভাবশালী মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা কিংবা বড় শিল্পপতির বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারত। এই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ড মানুষের মনে ভয় ও আস্থার এক অদ্ভুত ভারসাম্য তৈরি করেছিল; মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল যে, “দুর্নীতি করলে কেউ আইনের হাত থেকে বাঁচতে পারবে না, সে যতই প্রভাবশালী হোক না কেন।” তবে সিঙ্গাপুরের দুর্নীতি দমনের কৌশলে একটি অত্যন্ত আলোচিত ও অনন্য পদক্ষেপ ছিল—সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং মন্ত্রীদের বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ বেতন প্রদান করা। এই নীতিটির পেছনে কাজ করেছিল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দর্শন।
লি কুয়ান ইউর যুক্তি ছিল যে, যারা দেশের সবচেয়ে মেধাবী মস্তিষ্ক এবং যারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের যদি বাজারের অন্যদের তুলনায় কম বেতন দেওয়া হয়, তবে তারা অবচেতনভাবেই দুর্নীতির প্রতি ঝুঁকে পড়বেন। মেধাবীরা তখন সরকারি চাকরি ছেড়ে করপোরেট সেক্টরে চলে যাবেন কিংবা অসদুপায়ে আয়ের পথ খুঁজবেন। রাষ্ট্র যখন তার কর্মকর্তাদের এত উচ্চ বেতন এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধা দেয়, তখন সেই কর্মকর্তা আর সামান্য কিছু ঘুষের টাকার জন্য নিজের চাকরি, সম্মান এবং আরামদায়ক জীবনকে বিপন্ন করতে চান না। তার কাছে সততা বজায় রাখাই তখন সবচেয়ে লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এটি মানুষের মনস্তত্ত্বে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা তৈরি করে, যা তাকে যেকোনো ক্ষুদ্র লোভের হাত থেকেও রক্ষা করে। সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমনই হয়েছিল।
কিন্তু কেবল আইন বা বেতন দিয়ে সিঙ্গাপুর আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি; তারা মানুষের অন্তরে অপরাধের প্রতি এক তীব্র ঘৃণা এবং সামাজিক লজ্জার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। আজও সিঙ্গাপুর সমাজে দুর্নীতিকে কেবল একটি ‘আইনি অপরাধ’ হিসেবে দেখা হয় না; এটিকে দেখা হয় একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ‘সামাজিক অপমান ও নৈতিক দেউলিয়াত্ব’ হিসেবে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি কেবল আইনি সাজাই পান না, তাঁর সামাজিক পরিচিতি, পরিবার এবং পেশাগত জীবনে এমন এক চরম বয়কট ও অবমূল্যায়নের শিকার হতে হয় যে সে আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। এই সামাজিক লজ্জার ভয় সেখানে মানুষের অবচেতন মনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর তৈরি করেছে। লবিং, স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতির বদলে আজকের সিঙ্গাপুরে পদোন্নতি ও রাষ্ট্রীয় মূল্যায়নের একমাত্র ভিত্তি হলো কর্মীর নিখাদ সততা, দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পারফরম্যান্স। সেখানে একজন সাধারণ নাগরিক বা কর্মী জানেন যে মেধা এবং সততার জোরেই তিনি দেশের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারবেন। এমন আস্থা নাগরিকদের অন্তরে এনে দিয়েছে দেশের প্রতি সম্মান এবং নিজের প্রতি দৃঢ় আত্মসম্মান।
সিঙ্গাপুরের এই ঐতিহাসিক উত্থান বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার উৎস।
আসলে, যতক্ষণ না পর্যন্ত উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব শতভাগ সততা ও স্বচ্ছতার উদাহরণ স্থাপন করতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তৃণমূল বা নিচের স্তরের দুর্নীতি নিরসন করা অসম্ভব। নেতৃত্বকে আগে নিজের আঙিনা পরিষ্কার করতে হবে। সরকারি চাকুরিজীবীগণ যত দিন নিজেকে জনগণের সেবক বলে ভাবতে না পারবেন, ততদিন এই অভিশাপ থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। যতদিন ক্ষমতার চেয়ারকে ক্ষমতা প্রদর্শনের বদলে পবিত্র আমানত হিসেবে অনুভব করার মনস্তাত্ত্বিক সংস্কৃতি গড়ে না উঠবে, ততদিন এই পাপ চলতেই থাকবে।
তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বস্তরে সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টির সাথে সাথে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। দুর্নীতিবাজরা যেন সামাজিকভাবে বয়কট হয় সেই সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি সব ধরনের গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে গড়ে তুলতে হবে আত্মসম্মানী প্রজন্ম।
লেখক : মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক।
