১৮৮৬ সালে শিকাগোর হে মার্কেটে পুলিশ শ্রমিকদের ওপরে গুলি চালালে বহু শ্রমিক নিহত হন এবং তাদের স্মরণে ১৮৯০ সাল থেকে এই মে দিবস পালিত হয়ে এসছে। প্রথমে শ্রমিক সমাজ এটা পালন করত এবং তারপরে এটা আন্তর্জাতিক মে দিবসের রূপ নেয় এবং ৮০টি দেশ এই দিবসটি পালন করে।
মে দিবস পালনের ১৪০ বছরেও শ্রমিকের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় নি কেন?
তো আসলে শ্রমিকদের যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল মজুরির দাবিতে। সেই আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন এবং শুধু তারা না মানুষের যতরকম অধিকার আছে সেই অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের সবার প্রতি আমরা শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
তো শ্রদ্ধা নিবেদন করা, দিন পালন করা একরকম এবং অধিকার আদায় এটা আরেকরকম। এখন থেকে ১৪০ বছর আগে শ্রমিকরা জীবন দিয়েছিল। সারা পৃথিবীতে ঘটা করে মে দিবস পালন করা হয় কিন্তু শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে?
১. সাধারণ মানুষ বিক্ষিপ্ত বিশৃঙ্খল
শ্রমিকের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় নাই। বরং বৈষম্য আরো বেড়েছে। কেন? সাধারণ মানুষ বঞ্চিত মানুষ বিক্ষিপ্ত বিশৃঙ্খল, এক।
২. শোষকরা সঙ্ঘবদ্ধ সিন্ডিকেট
দুই হচ্ছে, শোষকরা সঙ্ঘবদ্ধ সিন্ডিকেট এবং তাদের একটা পলিসি আছে খুব ভালো। তাদের পলিসি হচ্ছে খ্যাপাও এবং পিটাও। প্রথম খ্যাপাবে তারপরে আপনি ভাংচুর করবেন। অর্থাৎ আপনি উত্তেজিত হবেন তারপরে পিটাবে।
ডিজনিল্যান্ড : শ্রমিক ও কোম্পানির সিইওর বেতনের পার্থক্যের উদাহরণ
তো ধরুন হে মার্কেটে যখন গুলি হলো শ্রমিক এবং একটা কোম্পানির সিইও তার বেতনের পার্থক্য ছিল হয়তো ২০ গুণ ২৫ গুণ ৩০ গুণ। এবং ধরুন এখন থেকে আরো পাঁচ বছর আগের কথা বলছি তখন পার্থক্য কত ছিল? আমেরিকার কথাই ধরি। ধরুন ডিজনি স্টুডিও এবং ডিজনির যে এন্টারটেইনার যারা ডিজনিল্যান্ড বিভিন্ন জায়গায় তারা করেছে। সেখানে ডিজনির মানে সমস্ত কার্টুন তার্টুন এগুলো দেখানো হয় এবং এদের নিয়ে প্যারেডও হয়।
এখন ডিজনির যে সিইও এবং তার প্রতিষ্ঠানের যে কর্মচারী যার হাসিমুখ আপনি দেখছেন। মুখ কিন্তু দুটো থাকে, একটা হচ্ছে অফিসিয়াল হাসি আরেকটা হচ্ছে আসল হাসি। আসলে আমরা যে হাসিটা দেখি এটা হচ্ছে অফিসিয়াল হাসি। আমরা আসল হাসি দেখি না আসল হাসি হাসতে পারে না।
একজন অভিনেত্রী অসুস্থ বাচ্চাকে ফেলে রেখে এসছেন। মঞ্চে হাসছেন হা হা মানে কী? মানে প্রাণখোলা হাসি। অভিনয় শেষ করেই দেখা যাচ্ছে তিনি দৌড়াচ্ছেন বিষণ্ন মুখে উৎকণ্ঠিত মুখে বাচ্চাকে দেখার জন্যে। কারণ তার যেহেতু ঐ সময় অভিনয় করতে হবে তার বাচ্চা দেখার তার সময় নাই। বাচ্চার যা হয় হোক।
অতএব কত কষ্ট ভেতরে চেপে রেখে তিনি যে হাসছেন এটা বোঝা যায়। এটা হচ্ছে অফিসিয়াল হাসি। এদের জীবনে আসল হাসি খুব কমই থাকে।
এই যে ডিজনির এন্টারটেইনার সেই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী এবং ডিজনির সিইও চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার। বেতনের পার্থক্য কত জানেন? চার বছর আগে এটা ছিল ১৪শ গুণ পার্থক্য ছিল।
ডিজনির অনেক কর্মচারী রয়েছে যাদের হাসি আপনারা দেখেন তারা রাত্রি কাটায় বাসায় না গাড়িতে। কারণ এক বেডরুমের যে বাসা এই বাসা ভাড়া নেয়ার মতো অর্থও তাদের নাই। পরিশ্রম করেও সেই অর্থ তারা পায় না।
কেন? আসলে যারা মেহনতি মানুষ যারা শ্রমিক তারা, বিক্ষিপ্ত বিশৃঙ্খল এবং যারা শোষক তারা সিন্ডিকেটেড। তারা এক রসুনে পাছা। এক জায়গায় তাদের গিট্টু। যে কারণে এই পার্থক্য। তাদের নীতিই হচ্ছে শোষণ অব্যাহত থাকতে হবে এবং শোষককে সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। কারণ ক্ষমতা যাদের হাতে তারা এই শোষক সম্প্রদায়েরই অন্তর্ভুক্ত।
শোষকের শোষণ থেকে বেরোতে নবীজীর (স) শিক্ষা কী?
বেরোনোর পথটা কী? বেরোনোর পথ হচ্ছে একটা।
১. দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে
সেটা হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে রি-একটিভ না প্রতিবাদ না প্রতিকার করতে হবে। প্রতিকার করতে হলেই বেসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে।
আরবের কথা। ধরুন ১৪শ বছর আগে একজন সাধারণ বেদুইন এবং অভিজাত কোরাইশ। তাদের লিভিং স্ট্যান্ডার্ড কী ছিল? সাধারণ বেদুইন এক টুকরা রুটি তার জন্যে অনেক কস্টলি ছিল। সারাদিনে একটা রুটি একটা রুটিও দেখা যেত যে দুই জন তিন জনে ভাগ করে খাচ্ছে। কস্টলি ছিল পেত না এবং অভিজাত কোরাইশদের প্রাচুর্য ছিল।
কেন? এখন যেরকম ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট। দুই টাকার ফুলকপি বাঁধাকপি ২৫ টাকা ৩০ টাকা এই কোরাইশদের যে সিন্ডিকেট ছিল পুরো ব্যবসা তারা নিয়ন্ত্রণ করত মধ্যপ্রাচ্যের। দুই টাকার জিনিস তারা এই ৩০ টাকাতে বিক্রি করত।
যার ফলে তাদের যে বিলাসিতা তাদের যে প্রাচুর্য এটা ছিল সীমার বাইরে। কারণ এদের অবাধ যাতায়াত ছিল তখনকার দিনের রোম পারস্য ইয়েমেন। অবাধ যাতায়াত ছিল সমস্ত দরবারে তাদের যাতায়াত ছিল। কারণ সমস্ত দরবারের বিলাসিতার যত জিনিস তারা সাপ্লাই দিত তারা নিয়ে যেত।
তো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যখন সমাজ উন্নত হয় তখন আসলে সাধারণ মানুষের সাথে বিত্তবানদের ব্যবধান আরো বাড়তে থাকে। এটা হচ্ছে নিয়ম। যে সাধারণ মানুষের অবস্থা কমতে থাকে বিত্তবানদের বিত্ত আরো বাড়তে থাকে।
যখনই অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে বিত্তবানদের বিত্ত বাড়বে পুঁজিবাদী সমাজে সামন্তবাদী সমাজে। যেরকম আমাদের বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে গত ২০ বছরে। যার ফলে অতিধনীর সংখ্যা বেড়ে গেছে গরিবের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। অতিধনীর সংখ্যা বেড়েছে গরিবের সংখ্যা বেড়েছে। যারা একটু মোটামুটি মাঝামাঝি পর্যায় ছিল তারা গরিবির পর্যায় যাচ্ছে যারা গরিব ছিল তারা ভূমিহীন হচ্ছে আর অতিধনীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ কিন্তু অতিধনীর দেশ।
ধরুন ১০ বছর আগে গার্মেন্টসের একজন যে শ্রমিক তার কাছে কিন্তু গ্র্যান্ড সুলতানের দৃশ্য ছিল না। এখন কিন্তু শ্রমিকও গ্র্যান্ড সুলতানের দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে। সে ঢুকতে পাচ্ছে না কিন্তু দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে এবং সেখানে নাকি একরাতে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয় থাকলে।
তো শ্রমিকের বেতন কত? এবং সেখানে যারা থাকতে যায় তাদের আয় কত? আমরা খুব সহজে বুঝতে পারি। ধরুন আমেরিকার বাজারে যে শার্টটা ৩০ ডলার ৫০ ডলার ২০ ডলারে বিক্রি হয় সেই শার্টটা সেলাই যে করছে সেই শ্রমিক কত মজুরি পাচ্ছে। ৫০ সেন্টের বেশি না।
আবার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হলে কী হয়? আরবেও একই অবস্থা ছিল। রসুলুল্লাহ (স) এলেন, তিনি অভিজাত কোরাইশদের মধ্যে জন্ম হলেও সাধারণ মানুষের জন্যে তার মন কেঁদেছে। সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্যে তিনি সংগ্রাম করলেন। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিটা চেঞ্জ করে দিলেন।
যখন মানুষের ভেতরে পরিবর্তন আসে তখন মানুষ কী হয়? ভালো মানুষ হয়। যেটাকে আমরা ইনসানে কামেল বলি অনন্য মানুষ বলি ভালো মানুষ হয় তখন সে। কারণ বাইরে থেকে কাউকে কেউ বদলাতে পারে না বদলাতে হয় ভেতর থেকে।
খলিফা হযরত ওমরের জোব্বার ঘটনা
আপনি দেখেন, হযরত ওমরের সময় দেখেন, হযরত ওমর তখন সুপার পাওয়ারের প্রধান। তখন পৃথিবীতে দুটো সুপার পাওয়ার ছিল পার্সিয়ান এম্প্যায়ার এবং রোমান এম্প্যায়ার। দুই এম্প্যায়ারই শেষ।
একক এম্প্যায়ার একক রাজ্য ওমর হচ্ছেন রাষ্ট্রপ্রধান। সম্রাট বলতে পারেন তখনকার ভাষায় যদি বলি ধর্মীয় ভাষায় খলিফা মানে প্রধান। তার এবং সাধারণ শ্রমিকের মধ্যে জীবনযাত্রার মানের তফাৎ ছিল? কোনো তফাৎ ছিল না। একজন সাধারণ মানুষ জিজ্ঞেস করল তাকে, ওমর তোমার জোব্বাটা লম্বা হলো কীভাবে? আমাদেরকে যে কাপড় দিয়েছ তাতে তো এত লম্বা জোব্বা হয় না। তুমি জোব্বাটা লম্বা করলা কীভাবে?
তো উনি তার ছেলেকে দেখিয়ে দিলেন যে বলো, তুমি বলো, তো ছেলের ভাগে যেটা পড়েছিল সেটা সে বাবাকে দিয়েছে বাবা জোব্বাটা লম্বা করেছেন। অর্থাৎ জোব্বা সমান দিতে হবে এটা ওমরকে বলে দিতে হয় নাই তার যেহেতু দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে অভিজাত ওমর সাধারণ মানুষের জীবন ধারণ করেছেন সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে তার জীবনের কোনো পার্থক্য নাই।
রসুলুল্লাহর (স) জীবন দেখেন, তিনি সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সবকিছু তিনি উৎসর্গ করেছিলেন মানুষের জন্যে। আসলে পরিবর্তনটা সবসময় আসে ভেতর থেকে, বাইরে থেকে নয়।
২. ঘৃণা দিয়ে নয়, জালিমকে জয় করতে হবে মমতা দিয়ে
নবীজী মানুষের ভাগ্যকে বদলিয়েছিলেন কীভাবে? ভালবাসা দিয়ে। শোষিতের প্রতি ভালবাসা শোষকের প্রতিও ভালবাসা। নবীজী (স) খুব সুন্দরভাবে বলেছেন যে, তুমি মজলুমকেও সাহায্য করো জালেমকেও সাহায্য করো।
তো একজন সাহাবী বলল যে ইয়া রাসুলুল্লাহ, মজলুমের সাহায্য তো বুঝলাম জালেমের সাহায্য কীভাবে হবে? তাকে জুলুম থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করো এটা হচ্ছে জালেমকে সাহায্য করা। আসলে ঘৃণা দিয়ে নয়।
আমরা যখন তরুণ ছিলাম তখন গান শুনতাম খুব কিষাণ মজুর পায় না যে মাঠের শ্রমের ফল তার প্রতিটি শস্যে আগুন লাগিয়ে দাও। এবং মনে হতো ভেতরটা লাফ দিয়ে উঠছে সবকিছুতে আগুন লাগিয়ে দিতে হবে।
তো পরে যখন মাথা ঠান্ডা হলো বুঝলাম যে আগুন লাগিয়ে দিলে প্রতিটি ফসল যদি জ্বলে যায় তো শ্রমিক খাবে কী? কৃষক খাবে কী? তারটাও তো থাকবে না। তার মানেটা কী? ঘৃণা দিয়ে নয় জয় করতে হবে মমতা দিয়ে ভালবাসা দিয়ে। যেটা রসুলুল্লাহ (স) করেছেন।
৩. ভালো মানুষ গড়তে হবে
এবং রসুলুল্লাহ (স) তাঁর জীবদ্দশায় ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন এবং তার পরবর্তী সময় খোলাফায়ে রাশেদা সাধারণ মানুষের জীবনটাকে পরিবর্তন করতে পেরেছেন কেন? তারা ভালো মানুষ গড়তে পেরেছিলেন।
এবং তারা তাদের কাজটা সবচেয়ে ভালোভাবে করেছিলেন। সেইজন্যে দুটো সাম্রাজ্যের পতন তারা ঘটাতে পেরেছিলেন। তারা তাদের কাজটা সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পেরেছিলেন এবং তারা সেই যুগের সবচেয়ে ভালো মানুষ ছিলেন যে জন্যে সারা পৃথিবীর মানুষ তারা যেখানে গিয়েছে তাদেরকে ওয়েলকাম করেছে এবং তারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গিটাকে গ্রহণ করেছে। তারা ভালো মানুষ ছিলেন।
নবীজীর (স) সময় শ্রমিকদের শোষণ এবং বঞ্চনার অবসান ঘটার কারণ কী?
একজন মানুষ যখন প্রাজ্ঞ হয় তখন সে ভালো মানুষ হতে পারে। এবং রসুলুল্লাহর (স) সাফল্য কোথায়? তিনি ভালো মানুষ করতে পেরেছিলেন যার ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী শোষণ এবং বঞ্চনার আগের যে রূপ ছিল সেই রূপ আসে নি। সেই রূপ আসে নি।
এবং খেলাফতের পরেও হযরত উসমানের সময় যে কারখানা, কলকারখানা ছোট ছোট ছিল কারখানার যা ইনকাম কারখানার যে মুনাফা তার একতৃতীয়াংশ পেত শ্রমিকরা। এবং এখন যদি কারখানার মুনাফার একতৃতীয়াংশ শ্রমিকরা পায় শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তনে আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নাই।
মালিক লাভ করবে করুক কিন্তু লাভের তো একটা কী থাকবে? সীমা থাকবে এবং যার শ্রমে জিনিস উৎপন্ন হচ্ছে তাকে লাভের একটা অংশ দিতে হবে এবং সেইসময় নিশ্চিত করা হয়েছিল। এম এন রায় খুব সুন্দরভাবে বলেছেন, যে সেইসময় শ্রমিক নিশ্চিত থাকত যে আমার এই মাল বিক্রি করে যদি লাভ হয় তাহলে লাভের এক-তিন অংশ আমি পাব। যার ফলে শ্রমিকদের শোষণ এবং বঞ্চনার অবসান ঘটেছিল।
[প্রজ্ঞা জালালি, ০৩ মে ২০২৫]
