এ ইউ দৌলা
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
‘শুভ সকাল’, ‘গুড মর্নিং’ কিংবা ‘আসসালামু আলাইকুম’- কারও সাথে সাক্ষাতে এই বাক্যগুলো দিয়েই আমরা একে অপরকে অভিবাদন জানাই। প্রাচীন গ্রিসের মানুষেরা একে অপরের সাথে দেখা হলে বলত ‘খাইরে’যার অর্থ হলো ‘আনন্দে থাকো’; রোমানরা সাক্ষাতে একে অপরের শারীরিক সুস্থতা ও শক্তির কামনা করে বলত ‘সালভ’ যার অর্থ হলো ‘সুস্থ থাকুন’; মুসলিমগণ বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম’, যার অর্থ ‘আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’; প্রাচীন ভারতের বৈদিক সংস্কৃতিতে গুরুজনদের সাথে সাক্ষাতে তারা বিনীতভাবে বলত ‘নমস্তে’ যার অর্থ ‘আপনার প্রতি সম্মান’, আবার পারস্যে মানুষেরা একে অপরকে দেখে বলত ‘দরুদ বার শমা’, যার অর্থ হলো ‘আপনার প্রতি শুভেচ্ছা’।
যুগে যুগে মানুষের শব্দচয়ন, ভাষা কিংবা উচ্চারণ বদলে গেলেও অভিবাদনের এই মূল প্রথাটি যেন একই; তা হলো অন্যের শান্তি, নিরাপত্তা এবং কল্যাণ কামনা করা; আর আজও বিশ্বজুড়ে এমনটাই প্রথা। আধুনিক মানুষ যদিও অতীতের অনেক প্রথাকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু প্রাচীন এই প্রথাটি আজও আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই প্রশ্ন জাগে, ‘শুভ সকাল’ বা ‘আপনার কল্যাণ হোক’ এসব কথার মানে আসলে কী? আমরা কেন এমন করি? আমি আপনার কল্যাণ কামনা করলাম আর অমনি আপনার মঙ্গল হলো- এটা কি যৌক্তিক? কিংবা কেউ কাউকে অভিশাপ দিল আর সেই অভিশাপে কারও ক্ষতি হয়ে গেল, এটা কি সম্ভব? এর পেছনে কি কোনো গভীর বিজ্ঞান আছে?
আধুনিক বস্তুবাদীরা যুক্তি-প্রমাণ ছাড়া সবকিছুকেই কুসংস্কারের লেবেল দিয়ে বাতিল করে দিতে অভ্যস্ত। কিন্তু আমাদের প্রাচীন সভ্যতাগুলো কি পুরোটাই অবৈজ্ঞানিক ছিল? প্রাচীন যুগের পিরামিড কিংবা মেগালিথিক স্থাপত্যগুলোর দিকে তাকালে আজও আমরা চরমভাবে বিস্মিত হই। কীভাবে শত টন ওজনের লক্ষ লক্ষ পাথর নিখুঁতভাবে কেটে পিরামিডের অত উঁচুতে স্থাপন করা হয়েছিল? কীভাবে লেবাননের বালবেক রোমান মন্দিরে হাজার টনের পাথরটিকে বসানো হয়েছিল? এসব দেখে প্রশ্নটা শুধু সেই পাথরে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ভাবনাটা আসে- যারা সেই অবিশ্বাস্য প্রকৌশল ও প্রযুক্তি আয়ত্ত করেছিলেন, তারা আসলে জীবন ও প্রকৃতি বিষয়ে আর কী কী বিজ্ঞান আয়ত্ত করেছিলেন? তাদের সেই প্রকৌশল ও সামাজিক সংগঠনের দক্ষতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: বস্তুগত প্রযুক্তির পাশাপাশি তারা মানব আচরণ, সামাজিক সহযোগিতা, বিশ্বাস এবং সমষ্টিগত আচরণ সম্পর্কে কী ধরনের ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন? হয়তো তারাই এসব প্রথা সৃষ্টি করেছিলেন যা আমরা এখনও বয়ে নিয়ে চলেছি। যেভাবে তারা পিরামিড বানিয়েছিলেন সেই জ্ঞান আজ আমাদের কাছে নেই, তেমনি কেন তারা এই রকম প্রথাগুলো চালু করেছিলেন তার ব্যাখ্যাও আমরা হয়তো পুরোপুরি বুঝতে পারছি না। তাই চলুন, বিজ্ঞান দিয়ে বিষয়টিকে বুঝতে চেষ্টা করি।
যখন আমরা কাউকে বলি, ‘আপনার সময়টা ভালো হোক’ কিংবা ‘আপনার জীবনে শান্তি বর্ষিত হোক’, তখন এটা কীভাবে কাজ করে? প্রায় সব ধর্মপ্রাণ মানুষেরা বিশ্বাস করেন যে দোয়া বা কল্যাণ কামনার মাঝে শক্তি আছে এবং দোয়া কখনো বৃথা যায় না। মানুষের জীবনে বিশ্বাস সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্বাসের মাঝে যে শক্তি আছে তা প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য। কিন্তু ইউরোপীয় ইতিহাসের রেনেসাঁ-পরবর্তী বস্তুবাদী দর্শন বিশ্বাসকে বাতিল করে শুধু যুক্তি ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে যে চমক সৃষ্টি করে চলেছে, সেকারণেই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ যুক্তি ছাড়া অন্য কোনো কিছু মানতে চায় না। তাই বিষয়টির আরও গভীরে যেতে চলুন দেখি স্নায়ুবিজ্ঞান ও কোয়ান্টাম বায়োলজি এই প্রশ্নগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে।
পারমাণবিক সংযোগ: যেখানে সবাই একে অপরের অংশ
বিজ্ঞান বলছে, পরিণত মানবদেহে প্রায় ৭ অক্টালিয়ন হাইড্রোজেন, কার্বন, অক্সিজেন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়ামসহ নানা মৌলের পরমাণু থাকে। কিন্তু প্রতিদিনই আমাদের শরীর থেকে প্রায় ১% পরমাণু ঝরে পড়ে এবং নতুন পরমাণু তার স্থান নেয়। এভাবে প্রায় প্রতি ১০০ দিনে শরীরের প্রায় অধিকাংশ পরমাণুই বদল হয়। এর অর্থ হলো, আজ আপনার শরীরে যে পরমাণুগুলো রয়েছে, তার প্রায় সবই ১০০ দিন আগে অন্য কোথাও ছিল, ১ বছর আগে সেগুলো হয়তো অন্য কোনো উদ্ভিদ, পতঙ্গ, প্রাণী বা মাটি-পাথরের অংশ ছিল। একইভাবে, আজ থেকে ১০০ দিন পর আমার ও আপনার বর্তমান শরীরটা চলে যাবে অন্য কোনো জীবের শরীরে।
এভাবেই ভূপৃষ্ঠের ওপরের স্তরে থাকা অণু-পরমাণুগুলো কোটি কোটি বছর ধরে নানা জীবের দেহে ঘুরে ফিরে বদল হয়ে চলেছে। এর অর্থ হলো, কোয়ান্টাম লেভেলে প্রতিটি জীবই যেন নিকট আত্মীয়, কেউ আলাদা নই- যেন একই দেহের অংশ; যেন আমরা একক প্রকৃতি নামক সত্তার বিশাল সিস্টেমের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সুতরাং, আমি যখন অন্য কারো কল্যাণ কামনা করি, পারমাণবিক সত্যের বিচারে আমি আসলে নিজেরই কল্যান কামনা করছি।
ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের খেলা
মস্তিষ্কের গভীরে প্রতিদিন যে নিউরাল প্রসেসিং হয়, তাই আমাদের আচরণ নির্ধারণ করে। স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, আপনি যখন কারও জন্য কল্যাণ চিন্তা করেন বা দোয়া করেন, তখন আপনার নিজের মস্তিষ্কের কেমিক্যালের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অন্যের কল্যাণ কামনার সময় মস্তিষ্কের ‘ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া’ থেকে ডোপামিন নিঃসৃত হয়। এটি আপনাকে তাৎক্ষণিক মানসিক শক্তি ও আনন্দ দেয়।
অন্যের মঙ্গল চিন্তা করলে শরীরের ‘ভ্যাগাস নার্ভ’ উদ্দীপিত হয় এবং বন্ডিং হরমোন অক্সিটোসিনের নিঃসরণ বাড়ে; এর ক্রিয়ায় হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক থাকে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে কার্ডিওভ্যাসকুলার স্বাস্থ্য উন্নত হতে থাকে। আপনি যখন অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হন, তখন মস্তিষ্কের ভয় ও উদ্বেগের কেন্দ্র ‘অ্যামিগডালা’ শান্ত হয়, ফলে কর্টিসল বা অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমে যায়। আবার আপনি যখন বুঝতে পারেন, কেউ আপনার জন্য দোয়া করছে বা আপনার কল্যাণ কামনা করছে, এই অনুভব আপনার মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে সংকেত পাঠায়, যা ‘সোশ্যাল প্লাসিবো’ হিসেবে আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও মানসিক দৃঢ়তা বাড়ায়।
বিজ্ঞান বলছে, মস্তিষ্কের মিরর নিউরন এমনভাবে কাজ করে যে, আমরা যখন অন্যের মুখে হাসি ফোটাই তখন সেই আনন্দের প্রতিচ্ছবি আমাদের ভেতরেও সৃষ্টি হয়; কিংবা আমরা যখন কাউকে কষ্ট দিই, তখন সেই কষ্টের প্রতিচ্ছবি নিজেদের জগতেও তৈরি হয়। কাউকে আঘাত করলে অপরাধবোধ থেকে মস্তিষ্কে অতিরিক্ত কর্টিসল ও এপিনেফ্রিন নিঃসৃত হয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি নিউরাল পাথওয়েগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, মনোযোগ কমায় এবং উদ্বেগের মতো মানসিক ব্যাধি তৈরি করে।
থিওরি অব ভাইব্রেশন এবং ফ্রিকোয়েন্সি
‘থিওরি অব ভাইব্রেশন’ বলে যে, এই জগতের সবকিছু নির্দিষ্ট মাত্রার কম্পন বা ফ্রিকোয়েন্সির মাঝে অস্তিত্বশীল। আমরা যখন লাল রঙের কোনো কিছু দেখি, আমরা আসলে দেখি একটা ওয়েভের খেলা। আমাদের চোখে যখন ৪০০ থেকে ৪৮০ টেরাহার্জ কম্পাঙ্কের ৬২০ থেকে ৭৫০ ন্যানোমিটার ওয়েভের আলো এসে পড়ে, তখন মস্তিষ্ক তাকে ‘লাল’ হিসেবে অনুভব করায়। একইভাবে, যে আলোর কম্পাঙ্ক ৫১০ থেকে ৫৩০ টেরাহার্জ এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য ৫৭০ থেকে ৫৯০ ন্যানোমিটার, সেটিকে হলুদ অনুভব করায়; যে আলো ৫২৬ থেকে ৬০৬ টেরাহার্জ কম্পাঙ্কে এবং ৪৯৫ থেকে ৫৭০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের, সেটিকে সবুজ হিসেবে অনুভব দেয়। এগুলি যদিও ভাইব্রেশনের খেলা, কিন্তু ব্রেইন সেটাকে নানা রঙে অনুভব করায়।
তবে আরও আশ্চর্যজনক হলো, ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাফি (EEG) প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে আমাদের প্রতিটি ভিন্ন অনুভূতির পেছনের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোরও একেকটি সুনির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি প্যাটার্ন কাজ করে। আমরা যখন গভীর ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা বা দোয়া অনুভব করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক আলফা এবং থিটা তরঙ্গে থাকে। এটি মস্তিষ্ককে একধরনের সুষম ফ্রিকোয়েন্সি দেয়; এর ফলে হার্টরেট স্বাভাবিক থাকে, শরীরের স্ট্রেস হরমোন কমে এবং স্নায়ুতন্ত্রে প্রশান্তির পরিবেশ তৈরি করে।
পক্ষান্তরে, যখন তীব্র রাগের অনুভব তৈরি হয়, তখন মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং আমাদের ফ্রিকোয়েন্সি দ্রুত বদলে উচ্চ কম্পাঙ্কের বিটা বা কখনো গামা তরঙ্গে চলে যায়, যা মস্তিষ্কে উত্তপ্ত বৈদ্যুতিক সিগন্যাল তৈরি করে শরীরকে ফাইট-অর-ফ্লাইট মোডে নিয়ে যায়। যখন কারো মধ্যে হিংসা বা পরশ্রীকাতরতার অনুভব কাজ করে, তখন মস্তিষ্ক একই সাথে রাগ, প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপের মিশ্রণে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ-কম্পাঙ্কের বিটা তরঙ্গ জেনারেট করতে থাকে, যা প্রতিনিয়ত কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো ক্ষতিকর হরমোন নিঃসরণ করে স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক সামঞ্জস্য নষ্ট করে দেয়।
এই ব্যাখ্যাটি বলে, আপনার অনুভবের সাথেই যুক্ত রয়েছে আপনার মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ কম্পাঙ্ক। তাই আমরা কী অনুভব করছি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ, মুখে কী শব্দ উচ্চারণ করছি সেটা হয়তো নয়। আপনি যদি কোনো কিছুর অর্থ না বুঝে শুধু ঠোঁটে ভালো শব্দ উচ্চারণ করেন, তবে কাঙ্ক্ষিত ফ্রিকোয়েন্সি তৈরি হবে না। কিন্তু যখন আপনার অন্তরে সত্যিকারের শুভকামনা ও ভালোবাসা থাকে, যখন আপনি গভীর মনোযোগে কিছু বলেন, দোয়া করেন বা অনুভব করেন, তখন তা স্নায়ুবিক ও কম্পনাঙ্কের স্তরে চারপাশের পরিবেশে সেই ওয়েভ ছড়িয়ে দিতে থাকে। আর চারপাশের একই ধরনের ওয়েভ একে অপরকে আকর্ষণ করে অনুনাদ ঘটাতে থাকে। ফলে আপনি যদি সকলের কল্যানের দোয়া অনুভব করেন তবে কল্যানের উৎসগুলো আপনার দিকেই এগিয়ে আসে। এভাবেই আপনি যেমন চিন্তার মানুষ হন তেমন চিন্তার মানুষদের সাথেই আপনার সংযোগ সৃষ্টি হতে থাকে। তাই, অন্যের কল্যাণ কামনা করা, কাউকে সাহায্য করা বা দোয়া করার প্রথাটি যে বৈজ্ঞানিক, তা স্পষ্ট। ব্যক্তিগত জীবনে এটি নিজেকে সুস্থ রাখার, কল্যাণকে নিজের দিকে আকর্ষণ করার এবং একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার বিজ্ঞান।
অনুভবই হলো আপনার সত্তা; অনুভবের সক্ষমতাই আমাদের প্রকৃত মানুষ বানিয়েছে। শব্দ উচ্চারণ রোবটের কাজ হতে পারে, কিন্তু মানুষই কেবল অনুভব করে। তাই আমরা যখন বলছি “আসসালামু আলাইকুম—আপনার ওপর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি ও রহমত আসুক”—তখন আমরা কি অন্তর থেকে অনুভব করে সেটা বলছি? আমরা যখন অন্য কোনো ভাষায় দোয়া উচ্চারণ করছি কিংবা কোনো তাসবিহ পড়ছি, তখন আমরা যা মুখে উচ্চারণ করছি সেটা হয়তো উপকারী, কিন্তু আমরা আসলে অন্তর থেকে কী অনুভব করছি, সেটাই দোয়ার শক্তি হয়ে ওঠে। অনুভবের স্পন্দনেই তৈরি হয় জীবনের অর্থ ও কল্যাণের শক্তি।
লেখক: মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক
