দৃষ্টান্তে মহানবী (স.): নৈতিকতা আর সততার পরীক্ষা কীভাবে সম্ভব? 

১৯৭৮ সাল। আমেরিকার বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করল একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘The 100: A Ranking of the Most Influential Persons in History’। এ গ্রন্থটির রচয়িতা ছিলেন মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ এবং নিবেদিতপ্রাণ ঐতিহাসিক মাইকেল হোরউইচ হার্ট। এটি ছিল মাইকেল এইচ হার্টের দীর্ঘ বছরের একান্ত সাধনা, গভীর মননশীল পাঠ এবং সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ। কোনো বিশেষ পক্ষপাত বা আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়; বরং তার মূল লক্ষ্য ছিল ইতিহাসের এমন এক নিরপেক্ষ মানদণ্ড তৈরি করা, যেখানে কোনো ব্যক্তির ভালো-মন্দ বিচার করা হবে না; বরং পরিমাপ করা হবে মানবজাতির ওপর তার কাজের গভীরতা, ব্যাপ্তি এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব।

হার্ট এবং তার সাথী ইতিহাস-বিশ্লেষকদের সামনে চ্যালেঞ্জটি ছিল বিশাল। প্রাচীন মিশর থেকে শুরু করে আধুনিক বিশ্ব পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষের মধ্য থেকে কীভাবে বেছে নেওয়া যায় সেই শীর্ষ ১০০ জন মানুষকে? ইতিহাসের সাহায্য নিয়ে তারা দীর্ঘ একটা তালিকা করলেন, তারপর সময় ধরে বিচার-বিশ্লেষণ করলেন প্রত্যেক ব্যক্তির আদ্যোপান্ত। তারা জানতে চাইলেন, কেমন ছিল সেই নেতার রাজনৈতিক ক্ষমতা? তিনি কি কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিলেন, নাকি তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বজুড়ে? তার প্রবর্তিত আদর্শ বা শাসন কাঠামো কি শত শত বছর ধরে টিকে আছে? এমনই সব কঠোর বুদ্ধিবৃত্তিক মানদণ্ড এবং ঐতিহাসিক তথ্যের নিরিখেই সাজানো হয়েছিল সেই তালিকা।

কিন্তু যখন বইটি প্রকাশিত হলো এবং বিশ্ববাসীর সামনে তালিকাটি এল, তখন অনেক পাঠকই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে পাশ্চাত্য জগতের মূলধারার ঐতিহাসিকদের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সেই তালিকার একেবারে শীর্ষস্থানটিতে, অর্থাৎ এক নম্বর স্থানে যাকে অভিষিক্ত করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।

খ্রিষ্ট ধর্মের নিবেদিত অনুসারী এবং খ্রিষ্টীয় বিশ্বে বেড়ে ওঠা একজন মার্কিন গবেষক কীভাবে ইসলামের নবীকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন? হার্ট অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়ে দেখিয়েছেন যে, তার এই গবেষণার মূল ভিত্তি ছিল কার্যকারিতা এবং ঐতিহাসিক স্থায়িত্ব। মাইকেল এইচ হার্ট তার বইয়ের ভূমিকায় স্পষ্ট করে লিখেছেন:

তালিকার শীর্ষে মুহাম্মদ (সা.)-কে স্থান দেওয়াটা অনেক পাঠককে হয়তো অবাক করতে পারে এবং কেউ কেউ হয়তো এর সমালোচনাও করবেন; কিন্তু ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি ধর্মীয় এবং পার্থিব, উভয় স্তরেই সর্বোচ্চ মাত্রায় সফল ছিলেন।… একজন খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারী হিসেবে এই তালিকায় আমরা যিশুখ্রিষ্টকেই পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু যুক্তির কাছে আমাদের আকাঙ্ক্ষা পরাজিত হয়েছে।’

সত্যিই মাইকেল এইচ হার্টের এই গবেষণা ছিল মানব ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি বোঝার এক অসাধারণ চাবিকাঠি। কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক কিংবা সামরিক জেনারেল হিসেবে কেন মুহাম্মাদ (স.) জগতের সকল নেতৃত্বের শিক্ষক, তা বুঝতে হলে আমাদের আরও একটু পেছন ফিরে লক্ষ্য করতে হবে অন্য এক দূরদর্শী ঘটনার দিকে।

‘মুহম্মদ (সা.) ছিলেন জগতের সেরা মানুষ এবং সততা ও নৈতিকতাই ছিল তার ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি’

—জগতের প্রত্যেক মুসলিমই এমন দাবি করে থাকেন। কিন্তু এই দাবি কেন এবং কীভাবে সঠিক, তা হয়তো অধিকাংশ মুসলিমগণ জানেন না। মুসলিম সমাজ, যারা মুহাম্মদ (সা.)-কে জগতের সেরা সত্যবাদী মানুষ বলে বিশ্বাস করেন, তারা অনেকেই হয়তো জানেন না যে, ‘সত্য’ আসলে কী? সত্য বলতে কী বোঝায় বা ‘ন্যায়’ শব্দটির প্রকৃত অর্থই বা কী। তারা কেবল তাদের শৈশব থেকে শেখা কিছু মানসিক কাঠামোর মাঝেই সবকিছু বিচার করেন এবং চারপাশের অন্যদের বলা কথাগুলোই নিজের বলে মনে করে তা পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন।

সত্য ও ন্যায়ের সংজ্ঞা বা ডেফিনেশন নিয়ে এপিস্টেমোলজি বা জ্ঞানতত্ত্বে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। একজনের কাছে যা ন্যায়, অন্যের কাছে সেটাই হয়তো বড় অন্যায়। অদ্ভুত হলেও সত্য যে, সত্য ও ন্যায়ের প্রকৃত সংজ্ঞা নিয়ে দার্শনিকগণ আজও একমত হতে পারেননি। তাই সত্য ও ন্যায়কে চিনতে হলে এমন একজন মানুষকে অনুসরণ করতে হয়, যিনি পরম সত্যবাদী। কিন্তু জটিল-কুটিল এই বিশ্বে কে আসলেই সত্যবাদী আর কে নিখুঁত কৌশলী শব্দের জাদুকর, তা কেবল একটিমাত্র মাপকাঠিতেই নির্ধারণ করা সম্ভব, আর তা হলো নেতার ব্যক্তিগত জীবন। তাহলে সত্য, ন্যায়, মিথ্যা এবং অন্যায় আসলে কী এবং কেন মুহাম্মাদ (স.) সত্য ও ন্যায়ের বাহক ছিলেন তা বুঝতে নিচের ঐতিহাসিক উদাহরণটির দিকে লক্ষ্য করা যাক।

হুদায়বিয়ার সন্ধির পর, আনুমানিক ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে পত্র পাঠানো শুরু করেন, তখন আমর ইবনে উমাইয়া আদ-দামরি (রা.)-এর মাধ্যমে এমন একটি আমন্ত্রণের চিঠি আবিসিনিয়ার (বর্তমান ইথিওপিয়া) রাজা নাজাশীর কাছেও পৌঁছেছিল। রাজা নাজাশী সাধারণ কোনো শাসক ছিলেন না; তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চমানের প্রজ্ঞাবান মানুষ। চিঠি পেয়ে নাজাশী তার দরবারের সব পাদ্রিদের ডেকে জানতে চাইলেন, কেউ মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কিছু জানে কি না। সে সময় উপস্থিত যাজকদের কেউই তেমন কিছু জানেন না বলে রাজাকে জানালেন। তবে এমন একজন দূতকে পাওয়া গেল, যিনি কিছুটা জানতেন।

নাজাশী অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন। তাই তিনি সব সময় বুঝতে চাইতেন প্রকৃত সত্য আসলে কী। তিনি জানতেন, কোনো মানুষকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে তার ব্যক্তিগত জীবনযাপনের পদ্ধতি লক্ষ্য করাই হলো সবচেয়ে উত্তম উপায়। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের পদ্ধতিই বলে দেয় সেই মানুষটি সত্যবাদী নাকি প্রতারক। প্রতারকরা নিজেদের সম্পদ, আভিজাত্য, মর্যাদা, খ্যাতি ও ভোগবিলাসের জন্য সমাজের মানুষকে কথার জাদুতে বশ করে। তারা অত্যন্ত কৌশলে মানুষের আবেগ ও বিশ্বাস ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাই কোনো নেতা, ধর্মগুরু বা সমাজপতিকে চেনার জন্য নাজাশী এক অসাধারণ মানদণ্ড বা টুলস ব্যবহার করলেন। তিনি সেই দূতকে প্রশ্ন করলেন, ‘এই যে ব্যক্তি মুহাম্মদ আমাকে চিঠি পাঠিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, তার সমর্থক এখন কত?’

উত্তরদাতা জানালেন, ‘প্রথম দিকে খুব অল্প কিছু মানুষ তার অনুসারী হয়েছিল, কিন্তু এখন তার অনুসারী লক্ষাধিক।’

নাজাশী আবার প্রশ্ন করলেন, ‘যখন তিনি এই ধর্ম প্রচার শুরু করেন, তখন তার জীবনযাপনের পদ্ধতি কেমন ছিল আর এখন যখন তার কয়েক লাখ অনুসারী আছে, তখন তার ব্যক্তিগত জীবনযাপন কেমন?’

উত্তরদাতা বললেন, ‘তিনি অত্যন্ত দরিদ্র জীবন কাটাতেন, দুই বেলা রান্না হতো কি না সন্দেহ ছিল; আর এখন যখন তার অগণিত অনুসারী, তখন তার সেই গরিবি অবস্থা আরও গভীর হয়েছে।’

সব শুনে নাজাশী তার গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে মন্তব্য করলেন, ‘ইনি সত্যবাদী।’

ভেবে দেখুন, আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে একজন রাজা কীভাবে সত্যের প্রকৃত মানদণ্ড অনুধাবন করেছিলেন! কী অসাধারণ ছিল নাজাশীর সেই দূরদর্শী প্রশ্ন! আজ আমরা সমাজের চারপাশে তাকালে দেখি, যারা দামি গাড়িতে চড়েন, অট্টালিকায় বাস করেন এবং বিলাসে জীবন কাটান, তারা নানা কৌশলে দরিদ্রদের বন্ধু সেজে নির্বাচনে অংশ নেন এবং জয়ীও হন। কিন্তু তারা যে জনগণের বন্ধু নন, তা তাদের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের চিত্র দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু রাসূল (সা.)-এর জীবনীতে দেখা যায়, তিনি কখনো কোনো বিলাসিতা করেননি। তিনি দরিদ্র মানুষের মতো খাবার খেয়েছেন, অত্যন্ত সাদামাটা পোশাক পরেছেন; তার কোনো রাজমুকুট বা রাজপ্রাসাদ ছিল না। খেজুরপাতার ছাল দিয়ে বানানো শক্ত বিছানায় তিনি ঘুমাতেন। তার কথাগুলো কেবল শব্দমাত্র ছিল না; তার প্রতিটি কথা ছিল তার জীবনযাপনের বাস্তব প্রমাণ। তাই তিনি যা বলতেন, সেটাই ছিল ন্যায়; তিনি যা উচ্চারণ করতেন, সেটাই ছিল সত্য।

যে কোনো নেতৃত্বের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যে, তাকে তার ব্যক্তিগত জীবনযাপনের পদ্ধতি জনগণের সামনে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে হবে। মানুষ দেখবে তাদের নেতা তাদেরই মতো একজন সাধারণ মানুষ; দেখবে তাদের নেতা তাদেরই মতো বিছানায় ঘুমায়, তাদেরই মত কাপড় পরে, খাবার খায় এবং জীবনযাপন করে। মানুষ যখন বিশ্বাস করবে যে তাদের নেতা নিজের বা নিজ পরিবারের নাম, ছবি বা মূর্তি বানিয়ে অমর করার জন্য লোভী নয়; মানুষ যখন বুঝবে তাদের নেতা কোনোভাবেই মিথ্যা ও অন্যায়ের সাথে আপস করেন না এবং নিজের চেয়ে জনগণকেই অগ্রাধিকার দেন, কেবল তখনই তারা নেতার কথাগুলো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করবে। জনগণের এই অবিচল বিশ্বাসই হলো নেতার প্রকৃত শক্তি এবং মানুষের আস্থাই হলো নেতৃত্বের মূলধন।

এ ইউ দৌলা

লেখক: মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক