টিনের ঘরের ধনী থেকে এসির ঘরের দরিদ্র—৫০ বছরে বদলে গেছে সুখের মাপকাঠি; ইসলাম যেখানে দেখায় প্রদর্শন নয়, উপভোগের পথ।
পঞ্চাশ বছর আগে গ্রামের যে ৫ শতাংশ মানুষ দুই বেলা ভাত খেতেন তাঁদেরই বলা হতো ‘ধনী’। আজ সেই গ্রামের ৯৫ শতাংশের বাড়িতে ফ্রিজ, টিভি আর এসি থাকলেও সুখ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আধুনিক অর্থনীতির থিওরি যেখানে ব্যর্থ, ইসলামের জীবনদর্শন কি দিতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনের মৌলিক সূত্র?
নানা ছিলেন সরকারি অফিসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। সারা গ্রামের মধ্যে মাত্র দুই জন চাকুরীজীবীর মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। একার উপার্জন কিন্তু নানার সংসারে ছিল তের জন মানুষ। অল্প কিছু জমি থেকে পাওয়া ফসল আর চাকুরির বেতনেই চলত পুরো পরিবার। তবুও অদ্ভুতভাবে গ্রামের মানুষ নানাকে ‘ধনী’ হিসেবেই জানত, মান্য করত। ধনীই তো, সারা গ্রামে দুইজনের একজন তিনি; আসলে, তখন ধনী হওয়ার মানদণ্ড ছিল খুবই সরল; যারা দুই বেলা পেট ভরে ভাত খেতে পেতেন আর যাদের বড় আকারের টিনের বা খড়ের কোন ঘর থাকত, সেই ৫% মানুষই ছিলেন ধনী।
অতীতের জীবনযাত্রা
গল্পটি মাত্র ৫০ বছর আগের; সেই সময়ে এমন ধনী পরিবার গুলোতে খাবারের তালিকায় থাকত মোটা চালের ভাত, ডাল, ঋতুভিত্তিক সবজি আর খাল-বিলের মাছ। মাংসের প্রচলন ছিল খুবই কম। ঈদের দিনে সেমাই হত, মিলাদ মাহফিলে হত দুধের পায়েশ, মুড়ি-মুড়কি ছিল অতিথি আপ্যায়নের মুল ব্যবস্থা। কার্তিক মাসের শেষের দিকে চাউলের কিছুটা সংকট হত তাই একবেলা রুটি খেতেন সেই সব পরিবার। নতুন পোশাক কেনার আনন্দ হত কেবল ঈদের সময়; মায়েদের জন্য ছিল বছরে দুটি সুতির শাড়ি, চাচা-মামাদের জন্য ছিল একটি পাঞ্জাবি। কেউ হয়ত এক ঈদে শার্ট কিনলে, অন্য ঈদের সময় প্যান্ট কিনতেন। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, গ্রামের সেই ৫% ধনী শ্রেণির মানুষ বা তাদের পরিবারের সদস্যদের মনে কিন্তু কোনো অতৃপ্তি কাজ করত না। একটি সাদা রঙের পাঞ্জাবি আছে কিন্তু হলুদ বা লাল রঙের পাঞ্জাবি নেই, এই অভাববোধ তাদেরকে দুঃখী করত না। আভিজাত রেস্টুরেন্টে খাওয়া কিংবা দেশ-বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার কোন আকাঙ্ক্ষা তখন কারো মাঝে ছিল না। নিজের গ্রাম, গ্রামের বটতলার বাজার, পাশের গ্রামে নানাবাড়ি এসব মিলিয়েই জীবন ছিল তাদের। খাবারের অভাব ছিল অধিকাংশ পরিবারে, অর্থের অভাব ছিল বাস্তব, কিন্তু তা সামাজিক জীবনে মানুষদের অন্তরে কোনো বড় ধরনের দহন সৃষ্টি করত বলে মনে হয় নাই।
বর্তমান প্রাচুর্য ও অসুখ
নানা- নানী গত হয়েছেন, তারা তাদের জীবনে যে অনেক দুঃখী ছিলেন কিংবা কোন কিছু না পাওয়ার তীব্র বেদনা নিয়ে জগত ছেড়ে গেছেন তা আমার মনে হয় নাই কখনও। অবশ্যই আমরা ভাগ্যবান; আজকের বাংলাদেশ গত ৫০ বছর আগের তুলনায় অনেক উন্নত। জ্ঞানীগণ বলেন, পরাধীনতা আর অভাবের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়েছে স্বদেশ। কথাটি হয়ত সত্য কারণ, আজ নানার সেই গ্রামের প্রায় ৯৫% বাড়িতেই ফ্রিজ-টিভি আছে, ঘরগুলো ইটের তৈরি, অনেকের বাড়ী একেবারে রাজপ্রাসাদের আদলে ডিজাইন করে বানানো হয়েছে। গ্রামে খাবারের অভাব নেই, কাজের অভাবও আগের মত নেই, একজন শ্রমিকের মজুরি প্রায় ৫০০ টাকার উপরে। গরু-খাসির মাংস খুব বেশি সহজলভ্য না হলেও মুরগির মাংস এখন নিয়মিত খাবার। শৌখিন পোশাক, জুতা আর অ্যান্ড্রয়েড ফোনের ছড়াছড়ি। অনেক বাড়িতেই এসি চলছে। কিন্তু এত প্রাচুর্যের পরেও মানুষেরা যেন সুখি নয়; প্রায় সকলেই এক আদিম অভাবের জ্বালায় জ্বলছে। স্বামীর উপার্জন দিয়ে সংসার চলছে না, তাই স্ত্রীকে কাজে বের হতে হচ্ছে। সব স্থানেই অভাবের এই তীব্র অনুভব যেন প্রতিটি অন্তরে দাউদাউ করে জ্বলছে।
আসল দারিদ্র্য কি অভাব নাকি অনুভূতি?
স্পষ্টভাবেই প্রশ্ন এসে যায়, এত অভাববোধ এলো কোথা থেকে? দারিদ্র্য আসলে কী? এমন কি হতে পারে যে কোটি টাকার মালিকও অভাববোধে আক্রান্ত? এমন কি হতে পারে যে, কুরিটি স্বর্ণপদক যিনি পেয়েছেন, সেই তিনি মাইকেল ফেলপ্সের আঠাসটি পদকের গল্প জানার পর নিজেকে দরিদ্র অনুভব করছেন? মনবিজ্ঞানের গবেষণা থেকে দেখা যায়, দারিদ্র্য কেবল অন্ন-বস্ত্রহীনতা নয়; এটি একটি মানসিক ব্যাধি। সত্যিকার অর্থে যারা খাদ্য বা আশ্রয়ের অভাবে আছেন, তাদের সংখ্যা হয়তো ৫%-এর নিচে। যাদের নুনতম খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই, শীত নিবারণের পোশাক নেই, নিজের একটা ঘর নেই তারা অবশ্যই সেসব পাওয়ার অধিকার রাখেন; কিন্তু সমস্যা হলো, এখন সমাজের বাকি ৯৫% মানুষও প্রতিদিন নিজেদের ‘দরিদ্র’ অনুভব করছেন যার মুলে রয়েছে, ‘আপেক্ষিক দারিদ্র্য’ (Relative Poverty)।
অভাবের চেইন রিঅ্যাকশন
অন্যের আলিশান বাড়ি দেখে নিজের ঘরটি ছোট মনে হচ্ছে; বন্ধুর নতুন গাড়িটি দেখে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসছে; চল্লিশ হাজার টাকার শাড়ি পরা কোনো পরিচিত নারীকে দেখে নিজের পঁচিশ হাজারের শাড়িটি খুবই লজ্জাজনক বলে মনে হচ্ছে । নিজের চেহারা নিজে দেখা যায় না; নিজের কী আছে তা দেখছি না, কিন্তু অন্যের কী আছে, তারা কি কি পেয়েছে তা দেখে নিজেকে বড্ড অভাবী আর দরিদ্র অনুভব হচ্ছে। সরকারী আর বেসরকারী পর্যায়ে দারিদ্র বিমোচনের অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। সেমিনার হচ্ছে, গবেষণা হচ্ছে; বিশ্বব্যাপী অসংখ্য আয়োজন হচ্ছে দারিদ্র মুক্তির পথ সন্ধান করার পেছনে। কিন্তু ধনিদের মাঝে যে অভাববোধ, সেই দারিদ্রতা কমানোর কোনো থিওরি কি আধুনিক অর্থনীতিতে আছে?
একজন ধনী ভদ্রলোক যখন অভাবের ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকেন তখন সেই ধনী আসলে চারপাশের হাজার মানুষের পকেট ফাঁকা করে দেয় কৌশলে; একজন হাজার কোটি টাকার মালিক যখন অভাবের অসুখে অসুস্থ তখন রাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোর দেওলিয়া হতে সময় লাগে না। অভাবের প্রতিযোগিতা আরও অভাবের জন্ম দেয় আর আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা মানুষকে কেবল ‘দেখানোর প্রতিযোগিতায়’ লিপ্ত করে চলেছে। একজনের দেখানো বিলাসিতা শত মানুষের অন্তরে আগুনের মতো অভাববোধ ছড়িয়ে দেয়; আবার সেই শত জন যখন তাদের বিলাশিতা অন্যদের দেখায়, তখন তা হাজার হাজার মানুষের মনে চেইন রিঅ্যাকশনের মতো অভাবের জ্বালা বাড়িয়ে দেয়। এটিই অভাবের ফিউসনে সুখের ফাঁদ।
ইসলামের দৃষ্টিতে সুখের সূত্র
আমরা সুখি হতে চায়, প্রতিটি সমাজ সুখের সন্ধান করে; রাষ্ট্র তার সংবিধানে সুখি হওয়ার অধিকারকে মৌলিক অধিকার বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সুখ যে কোথায় তা অত্যন্ত অস্পষ্ট। আসলে সুখের সন্ধানে মানুষেরা আজ যে পথে ছুটে চলেছে, তা সুখী হওয়ার মূল সূত্রের ঠিক বিপরীত। সুখ তো আসলে একটি অনুভব, আর অভাবের তীব্র অনুভবই সেই সুখের পথে মূল বাধা। সুখবোধ যদি পজিটিভ অনুভুতি হয় তবে অভাববোধ হল নেগেটিভ অনুভুতি; সুখ যদি উত্তরে থাকে তবে অভাববোধ মানুষকে দক্ষিণে নিয়ে যায়। কিন্তু মানব সভ্যতাকে সাহায্য করতে ইসলাম ধর্ম সুখি হওয়ার যে জীবন দর্শন প্রচার করেছে তা সত্যিই বিস্বময়কর। মানুষকে লক্ষ্য করে ইসলাম বলেছে, যা কিছু সুন্দর আর উপভোগ্য তা উপভোগ করো, কিন্তু তা অন্যদের প্রদর্শন করো না। নিজের যা কিছু আছে তা অন্যকে দেখানোর মানসিকতাকেই ইসলাম বড্ড বড় গুনাহ বা অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে নিজের যা কিছু সুন্দর তা দেখানো, কিংবা বিলাসিতা প্রদর্শন করা কোন স্বাধীনতা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক অপরাধ। কারণ, প্রদর্শন থেকেই প্রতিযোগিতার জন্ম হয়, আর প্রতিযোগিতা থেকেই জন্ম নেয় সব অশান্তি, অভাববোধ আর অপরাধ। ইসলাম বলেছে, সুখের ইঞ্জিনিয়ারিং এখানেই আর দুক্ষের ইঞ্জিনিয়ারিংও এখানেই।
উপসংহার:
একটি প্রশ্ন, আধুনিক যুগের মুসলিমগন কি আসলেই এই দর্শনের অনুসারী? নাকি ধর্মকে কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠান ও উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেই প্রশান্তি খুঁজে চলেছেন জগতের মুসলিমগণ? আর্থিক উন্নয়নের সঙ্গে যদি মানসিক মুক্তি না আসে, তবে সেই উন্নয়ন কি সত্যিই উন্নয়ন?
লেখক: এ ইউ দৌলা (লেখক ও মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক)
