প্রার্থনা শুধু কিছু শব্দ উচ্চারণ নয়। স্রষ্টার সাথে কথোপকথন। অন্তর খুলে প্রভুর কাছে আকুতি প্রকাশ করা। স্রষ্টা প্রার্থনা পছন্দ করেন। পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারা-র ১৮৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, —হে নবী! আমার বান্দারা যদি আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে তখন তাদের বলো, আমি তো তাদের খুব কাছেই আছি। প্রার্থনায় আমাকে যে ডাকে, আমি তার ডাক শুনি, তার ডাকে সাড়া দেই।’ আসলে প্রভু সবসময় আমাদের ডাকে সাড়া দেয়ার জন্যে প্রস্তুত আছেন।
কেউ কেউ ভাবেন যে নিজের চেষ্টাই সব, প্রার্থনার দরকার নেই। আবার কেউ ভাবেন, সবকিছু যখন স্রষ্টার হাতেই, তখন আমাদের আর করার কী আছে! শুধু কাজ করলে আপনি ক্লান্ত হবেন। শুধু প্রার্থনা করলে আপনি স্থির হবেন। কিন্তু কাজ এবং প্রার্থনা করলে আপনি এগিয়ে যাবেন। কাজ আর প্রার্থনা মোটেও একে অপরের বিপরীত নয়, বরং এরা পরিপূরক।
আমাদের অসুবিধা কোথায় হয়? আমরা প্রভুর বিশালত্বকে অনুভব করতে পারি না। যে কারণে প্রার্থনা করতে ভয় পাই। ভাবি, এত কিছু দেয়ার সামর্থ্য প্রভুর আছে কিনা? অথচ হাদীস শরীফ বাংলা মর্মবাণীর ৪৪১ নম্বর হাদীসে বলা হয়েছে, ‚আর তোমরা সকল মানুষ যদি সবাই সমবেত হয়ে চাইতে থাকো এবং তোমাদের সব চাওয়া যদি আমি পূরণ করে দেই এবং তা যদি তোমরা নিয়ে যেতে থাকো, তবুও তোমরা শুধু ততটুকুই নিতে পারবে, সমুদ্রে একটি সুচ ডুবিয়ে তা তুললে যতটুকু পানি সুচের গায়ে লেগে থাকে। অর্থাৎ প্রভুর দেয়ার সামর্থ্য সীমাহীন।’
প্রার্থনার তিনটি স্তর :
১. ব্যবহারিক স্তরে : পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট, ভালো চাকরি অর্থাৎ যে ধরনের লক্ষ্য অর্জন করতে চাই তার জন্যে প্রাণান্ত পরিশ্রম করার সাথে সাথে প্রার্থনা করব যেন আমার চেষ্টা যেন সফল হয়।
২. মানসিক স্তরে : প্রার্থনা আমাদের মনকে শান্ত করে, ফোকাস বাড়ায় এবং উদ্বেগ কমায়। আধুনিক মনোবিজ্ঞান একে বলছে —মাইন্ডফুল ইনটেনশন সেটিং’। সচেতনভাবে বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগী থেকে নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
৩. আত্মিক-আধ্যাত্মিক স্তরে : প্রার্থনা আমাদের বিনয়ী করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা সবকিছুর নিয়ন্ত্রক নই। আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। এই বিনয় আমাদের আরো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞান কী বলছে?
হয়তো মনে হতে পারে, এগুলো শুধু আবেগ বা বিশ্বাসের কথা। কিন্তু বিজ্ঞান কী বলছে? ২০২৪ সালে Baylor University-এর গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত প্রার্থনা করে, তাদের মধ্যে সুখ, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্থিরতা বেশি। আর যারা প্রার্থনা করে না, তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা বেশি অর্থাৎ কাজ আমাদের সফল করতে পারে, কিন্তু প্রার্থনা আমাদের শান্তি দেয়। হার্ভার্ডের এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা প্রতিদিন প্রার্থনা করে, তাদের মধ্যে হতাশা কম এবং জীবনের প্রতি সন্তুষ্টিবোধ বেশি থাকে।
প্রার্থনার রয়েছে নিরাময় ক্ষমতা : আধুনিক বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান এখন স্বীকার করছে যে, প্রার্থনার এক গভীর নিরাময়ী শক্তি রয়েছে। জার্নাল অফ বিহেভিওরাল মেডিসিন-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত প্রার্থনা বা আধ্যাত্মিক চর্চা করেন, তাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় কম হয়।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট ড. অ্যান্ড্রু নিউবার্গ দীর্ঘ ২০ বছর ধরে প্রার্থনা ও ধ্যানের সময় মানুষের মস্তিষ্ক স্ক্যান করেছেন। তার গবেষণায় দেখা গেছে, প্রার্থনার সময় মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব (যা মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজটি করে) অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। একই সময়ে প্যারাইটাল লোব (যা আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার সঙ্গে জড়িত) কম সক্রিয় হয়। অর্থাৎ মানুষ তখন নিজের ক্ষুদ্রতাকে ভুলে গিয়ে বৃহত্তর কিছুর সঙ্গে সংযুক্ত অনুভব করে। এর মানে কী? প্রার্থনা আমাদের মস্তিষ্ককে কাজের জন্যে আরো ভালোভাবে প্রস্তুত করে।
মহামানবদের জীবনে কাজ ও প্রার্থনা ছিল একাকার : আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, দেখব যারা পৃথিবী বদলে দিয়েছেন, তারা কাজ ও প্রার্থনা – দুটোকেই সমানভাবে কাজে লাগিয়েছেন। পাকিস্তানের —অ্যাঞ্জেল অফ মার্সি’ খ্যাত আবদুল সাত্তার ইদির কথা আমরা অনেকেই জানি। তিনি একটি ভাঙাচোরা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে সেবা শুরু করেছিলেন। তার সম্বল বলতে কিছুই ছিল না, কিন্তু তার বিশ্বাস ছিল – ‚আমি কাজ করব, আর প্রভু আমাকে পথ দেখাবেন।” এই কাজ আর প্রার্থনার শক্তিতেই তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। তিনি হাজার হাজার এতিম শিশুকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।
ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী এ.পি.জে. আবদুল কালাম তার —উইংস অফ ফায়ার’ বইয়ে লিখেছেন, ‚আমি প্রতিটি রকেট উৎক্ষেপণের আগে প্রার্থনা করতাম। আমি আমার কাজে পুরোপুরি বিশ্বাস রাখতাম, কিন্তু আমি জানতাম যে আমার চেষ্টার বাইরেও একটি শক্তি আছে যা সাফল্য নির্ধারণ করে।”
আমরা পরম করুণাময়ের কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, কোয়ান্টামের পথচলায় সবসময় আমরা প্রার্থনাকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছি। আমরা অনুভব করি, সবসময় পরম করুণাময়ের দয়া ও করুণা আমাদের সাথে রয়েছে। দেশের সার্বিক কল্যাণের জন্যে গত দুই বছর কোয়ান্টামের সদস্যরা বিশেষ প্রার্থনা খতমে কামালি করেছি। প্রতি মাসে প্রজ্ঞা জালালিতে বিশেষ দোয়ার আয়োজন থাকে।
তাওয়াক্কুলের ধারণা : তাওয়াক্কুলের সহজ অর্থ হলো, ফলাফল নির্ধারণর মালিক প্রভু, সর্বোচ্চ চেষ্টার পরেও ফলাফল স্রষ্টার হাতে ছেড়ে দেয়া। কর্তব্য কর্মে অবহেলা না করে কাজ করে যাওয়া এবং স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসে অটল থাকা। রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, —আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো, কিন্তু তোমার উটটাকেও বেঁধে রাখো ভালোভাবে। (অর্থাৎ সতর্কতা ও করণীয় কর্তব্যে অবহেলা করবে না।)’ আনাস ইবনে মালেক (রা); তিরমিজী। অর্থাৎ আমার যা যা করার তা আমি আন্তরিকতা নিয়ে সবচেয়ে ভালোভাবে করব। এরপর বাকিটা প্রভুর দয়ার ওপর নির্ভর করব।
আল্লাহর ওপর নির্ভর কীভাবে করতে হয় তা-ই রসুলুল্লাহ (স) তাঁর উম্মতকে শিখিয়েছেন হিজরতের পুরো ঘটনার মধ্য দিয়ে। গোপনীয়তা, তথ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ সংগ্রহ, তাঁকে খোঁজার তুঙ্গ মুহূর্ত প্রথম তিন দিন আত্মগোপনে অবস্থান, লোকালয় বিবর্জিত পথে চলার জন্যে দক্ষ নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক সংগ্রহ থেকে শুরু করে তাঁর পক্ষে সম্ভব সবকিছু করার পর তিনি নিজেকে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে দিয়েছেন। আমার অংশ আমি করেছি এবার আল্লাহ তোমারটুকু তুমি করো! এটাই হচ্ছে তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ! পবিত্র গীতায় বলা হয়েছে, —কাজ করো কিন্তু ফলের আশায় কাজ কোরো না। ফল নির্ধারণ করেন ঈশ্বর।’ অর্থাৎ কাজ করার মালিক আমি, আর ফলের মালিক হলেন স্রষ্টা।
করণীয় :
১. প্রতিদিন সকালে ১০ মিনিট বের করুন প্রার্থনার জন্যে : প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইল ফোনটি হাতে নেওয়ার আগে অন্তত ১০ মিনিট সময় নিজের জন্যে বের করে নিন। চুপ করে বসুন, যা কিছু পেয়েছেন তার জন্যে কৃতজ্ঞতা জানান এবং সারা দিনের কাজের জন্যে প্রার্থনা করুন- —হে করুণাময়, আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্যে, নিজের ও মানুষের উপকারের জন্যে এই কাজটি করছি। আমাকে সঠিক পথ দেখাও।’ এই সহজ অভ্যাসটি আমাদের পুরো দিনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
২. বিরতির সময় মৌন প্রার্থনা : কাজের ফাঁকে যখন ক্লান্ত বোধ করেন, তখন চোখ বন্ধ করে এক মিনিট স্রষ্টাকে স্মরণ করুন। এটি আপনার মনের রিচার্জেবল ব্যাটারির মতো কাজ করবে।
৩. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ : সকল পরিস্থিতিতে কৃতজ্ঞ থাকুন। এমনকি চরম প্রতিকূলতার মুখেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। আর সফল না হলে ধৈর্য ধরুন এবং প্রার্থনা করুন যেন এর চেয়ে উত্তম কিছু আপনাকে দেওয়া হয়।
৪. ঘুমানোর আগে প্রার্থনা : মোবাইল স্ক্রল না করে ঘুমানোর আগে ৫ মিনিট সময় নিন। সারা দিনটির পর্যালোচনা করুন। কী কী ভালো হয়েছে? কী আরো ভালো হতে পারত? স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন এবং আগামীকালের জন্যে প্রার্থনা করুন।
৫. অন্যের জন্যে প্রার্থনা : শুধু নিজের জন্যে নয়, অন্যের জন্যেও প্রার্থনা করুন। যখনই যার কথা মনে হবে তার জন্যে আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করুন। প্রার্থনা সুন্দরভাবে করার জন্যে কোয়ান্টামে প্রার্থনার একটি অণু বই রয়েছে। আমরা এটি সংগ্রহে রাখতে পারি।
৬. পরিবারে যৌথ প্রার্থনার চর্চা করুন : যে পরিবারের সবাই শুধু উপার্জন আর খরচ নিয়ে ব্যস্ত থাকে কিন্তু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, একসাথে প্রার্থনা করে না, সেই পরিবার ধীরে ধীরে একটি হোটেলে পরিণত হয়। সবাই একই ছাদের নিচে কিন্তু কেউ কারো পাশে নেই। তাই পারিবারিকভাবে একসাথে দোয়ার অভ্যাস করতে হবে।
৭. ধ্যানমগ্ন প্রার্থনা : মেডিটেশন কাজের একাগ্রতা বা ফোকাস বৃদ্ধি করে। নিয়মিত মেডিটেশনের অনুশীলন আপনার প্রার্থনাকে আরো শক্তিশালী করবে। আপনি মন থেকে স্রষ্টার কাছে চাইতে পারবেন, আকুতি জানাতে পারবেন। এজন্যে মেডিটেশন শিখুন। কোয়ান্টামে আসুন। যত নিয়মিত মেডিটেশন করবেন, তত প্রার্থনায় একাগ্রতা সৃষ্টি হবে। আর একাগ্রচিত্তে করা প্রার্থনাই প্রভু কবুল করেন।
কোয়ান্টামের মূল শক্তি প্রার্থনা : কোয়ান্টাম প্রার্থনায় বিশ্বাস করে এবং সদস্যদের প্রার্থনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর এই প্রার্থনা হতে হবে অন্তর থেকে। কোয়ান্টামের এই সুদীর্ঘ ৩৪ বছর পথ চলছে কাজ ও প্রার্থনার অপূর্ব সমন্বয় করে। প্রতি শুক্রবার সাদাকায়নে নিজের, পরিবার ও দেশের মঙ্গলের জন্যে নিয়মিত প্রার্থনা করি।
মনে রাখতে হবে, আমাদের হাত দুটো দেওয়া হয়েছে কাজ করার জন্যে, আর হৃদয়টা দেওয়া হয়েছে প্রার্থনা করার জন্যে। আসুন, আমরা এই দুটোরই একযোগে সর্বোচ্চ ব্যবহার করি। আজ থেকেই আমাদের প্রতিটি কাজের শুরুতে এবং শেষে প্রার্থনাকে সঙ্গী করি। বিশ্বাস করুন, স্রষ্টা কখনো তার বান্দার পরিশ্রম এবং আকুতিকে বৃথা যেতে দেন না।
জীবনে যখনই আমরা কোনো সংকটে পড়ব, কর্মক্ষেত্রে বা ব্যক্তিগত জীবনে ব্যর্থতার মুখোমুখি হব – তখন আমরা একসাথে দুটি কাজ করব। এক, আমরা পূর্ণ উদ্যমে কাজে নেমে পড়ব। দুই, আমরা পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করে বলব, ‚আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করব, আর ফলাফলের ভার তোমার হাতে সঁপে দিলাম।”
তাই প্রতিদিন হাজারো কাজের ভীড়ে প্রার্থনায় নিমগ্ন হোন, নিজের জন্যে এবং অপরের জন্যে। প্রভু আমাদের সকল কল্যাণকর প্রার্থনা কবুল করুক।
