শৃঙ্খলাই জীবন

শৃঙ্খলাই জীবন
মংপ্রু মার্মা
হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, বান্দরবান সরকারি কলেজ.

লামা রূপসীপাড়া ইউনিয়নে আমার জন্ম। আমাকে পড়ালেখা করানোর কোনো সামর্থ্য মা-বাবার ছিল না। তাই তারা চাইতেন এমন একটা স্কুলে ভর্তি করাতে যেখানে কোনো খরচ দেয়া লাগবে না। অবশেষে তারা খুঁজে পেলেন কোয়ান্টাম কসমো স্কুল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব খরচ বহন করবে এ আশায় আমার মা-বাবা আমাকে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।

২০০৪ সালে কোয়ান্টামে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম। নতুন জায়গা ও অপরিচিত মানুষ, কেউ কাউকে চিনি না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মা-বাবার ইচ্ছাপূরণ করার জন্যে কষ্ট করে এখানে থেকে গেলাম। ছোট অবস্থায় মা আমাকে বুঝিয়ে ছিলেন, বাড়িতে থাকলে পড়ালেখা করতে পারব না। আর কোয়ান্টামে থাকলে শিক্ষিত হয়ে অনেক বড় মানুষ হবো। তাই নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলাম। স্কুলে আমি খো খো ও কাবাডি খেলার সাথে যুক্ত ছিলাম। ২০১২ সালে পঞ্চম জাতীয় খো খো, ২০১৩-তে অষ্টম বাংলাদেশ গেমস ও ২০১৪-তে স্বাধীনতা কাপে অংশ নিয়ে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম।

কোয়ান্টাম কসমো স্কুল থেকে আমি ভালো রেজাল্ট করে মাধ্যমিক সম্পন্ন করি। স্কুলে পড়া অবস্থায় বার্ষিক ছুটিতে বাড়ি গেলে মা-বাবা আমাকে পেয়ে অনেক খুশি হতেন। এলাকার অন্য অভিভাবকেরা বলতেন, আমি কোয়ান্টামে পড়ছি তা-ই ভালো মানুষ হবো। আশেপাশের সব মানুষ প্রশংসা করত। তারাও নিজেদের সন্তানদের কোয়ান্টামে রাখতে চাইতেন। কিন্তু একটা আবাসিক স্কুলে থাকতে গেলে অনেক নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। সেটা অনেকে পারে না। আর কোয়ান্টামে তো দুয়েকজন না, হাজার হাজার ছাত্র। তাই অনেক নিয়নকানুন থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এই নিয়মগুলো যদি সুষ্ঠুভাবে মেনে চলা হয়, তাহলে অবশ্যই আলোকিত মানুষ হওয়া সম্ভব। আসলে নিয়ম ছাড়া জীবনে কোনোকিছু করা সম্ভব নয়।

আমি এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পরে কোয়ান্টাম থেকে চলে আসি। ঐ সময় আমাদের পারিবারিক অবস্থা ভালো ছিল। মা-বাবার হাতে কিছু টাকা ছিল। বাড়ির গোয়ালে অনেকগুলো গরু ছিল। তখন মা-বাবাকে বলেছিলাম, আমি তো ১০ বছর ধরে কোয়ান্টামে আছি। এখন বাইরের কোনো কলেজে পড়াশোনা করতে চাই। মা-বাবা অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হয়েছিলেন। ঐ সময়ে আমার মামা আমাকে সাহায্য করেছিলেন। আমি ঢাকার একটি মিশনারি কলেজ

থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেছি। তারপর আমি বান্দরবানে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে গেলাম।

আমি যখন তৃতীয় বর্ষে পড়ি তখন আমাদের পরিবারের অবস্থা আবার খারাপ হতে শুরু করল। আমার মা-বাবা তামাক চাষ করেন। তামাক চাষ করতে প্রচুর শ্রমিক ও খরচ লাগে। একদিকে আমাদের চার ভাইবোনের পড়ার খরচ, অন্যদিকে তামাক চাষের খরচ। সেইবারে তামাক ফলন একেবারে ভালো হয় নি। ফলে আমরা আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হই। ঐ বছর তামাক চাষ করে প্রায় চার লাখ টাকা লোকসান হয় আমাদের। মা-বাবা কষ্ট নিয়ে বললেন, তারা আমার পড়ালেখার খরচ দিতে পারবেন না। আমার লেখাপড়ার খরচ আমাকেই বহন করতে হবে। উপায় না পেয়ে আমি বান্দরবানের একটি মার্মা হোস্টেলে ভর্তি হই। লেখাপড়া খরচের জন্যে টিউশন করাতে শুরু করি। এভাবেই অনার্স শেষ করলাম।

লেখাপড়ার পাশাপাশি এখন আমি কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে আছি। কারণ এখানে থাকলে আমি সুশৃঙ্খল একটি লাইফস্টাইল মেনে চলতে পারি।

[ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘সব সম্ভব’ বই থেকে ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *