মৌমাছি সাধারণত ৬২ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে নিজের খাবার খুঁজে নিতে পারে এবং তারা প্রতিনিয়ত খাদ্যের উৎস পরিবর্তন করে থাকে। প্রতিটি মৌমাছি খাবারের সন্ধানে ছয় মাইল পর্যন্ত যেতে পারে এবং তার পেট খালি থাকলে ঘণ্টায় সে ১৫ মাইল বেগে চলতে পারে। একটি মৌচাকে যদি মাত্র একটি মৌমাছি থাকে এবং সে যদি এক পাউন্ড মধু তৈরি করতে চায়, তাহলে তাকে ৯০ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে। আর ২৪০টি মৌমাছি থাকলে প্রত্যেককে ভ্রমণ করতে হবে ৩৭২ মাইল। কিন্তু মৌমাছি অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী, তাই তারা পরিশ্রমটাকে অনেক কমিয়ে ফেলে। কারণ একেকটি মৌচাকে থাকে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক মৌমাছি। আর তারা একা কাজ করে না, দুজনেও করে না, এমনকি ২০০ জনেও না, ওরা কাজ করে সঙ্ঘবদ্ধভাবে।
২৫ জুলাই ২০২৬ শনিবার কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আয়োজিত মুক্ত আলোচনার ১৪১ তম পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথাগুলো বলেন শিক্ষাবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ডার্টমাউথ-এর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আতাউল করিম। উল্লেখ্য, মুক্তচিন্তার প্রসার ও শত ভাবনার বিকাশে নানা বিষয়ে ২০০৩ সাল থেকে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আয়োজন করছে মুক্ত আলোচনা কার্যক্রম। এ পর্বে আলোচনার বিষয় ছিল ‘মামুলি এক মৌমাছি!’
মুক্ত আলোচনায় প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আতাউল করিম আরো বলেন, পবিত্র কোরআনে আন-নহল একমাত্র সূরা যেখানে মৌমাছি নিয়ে বলা হয়েছে। এটা কোরআনের ১৬ নম্বর সূরা। এর ৬৮ নম্বর আয়াতে আছে মোট ১৬টি শব্দ। আর এ ১৬টি শব্দে আছে ১৬টি অক্ষরের সমাহার। আশ্চর্য হলো, স্ত্রী মৌমাছির ক্রোমোজম সংখ্যা ১৬ জোড়া এবং পুরুষ মৌমাছির ক্রোমোজম রয়েছে ১৬টি।
সূরা আন-নহলের ৬৯ নম্বর আয়াতের এক জায়গায় আছে, ‘মৌমাছির উদর থেকে নিঃসৃত হয় বর্ণিল পানীয়। এতে মানুষের জন্যে রয়েছে নিরাময়।’ এই বর্ণীল পানীয় বা মধু মৌমাছির তেমন প্রয়োজন নেই। এটা বেশি প্রয়োজন মানুষের জন্যে। এছাড়া মৌমাছির চাকের কোষগুলো বৃত্তাকারও নয় চতুর্ভুজাকারও নয়—ষড়ভুজাকার (হেক্সাগোনাল)—যার কারণে তারা অল্প জায়গায় বেশি পরিমাণ মধু সংরক্ষণ করতে পারে।
গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল তার Historia Animalium গ্রন্থে মৌমাছি পর্যবেক্ষণ করে লিখেছেন, খাবারের উৎসের ব্যাপারে মৌমাছিরা পরস্পরের সাথে তথ্য বিনিময় করে এবং ফিরে আসার সময় একটা বিশেষ ছন্দে নাচে।
এর প্রায় দুই হাজার বছর পরে, ১৯১৯ সালে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী কার্ল ভন ফ্রিশ প্রথম মৌমাছি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি মৌমাছিদের মধ্যে নাচের বিশেষ প্যার্টান লক্ষ করেন। এই নাচটাকে বলা হয় ‘ওয়েগ্যাল ডান্স’। এটা অনেকটা ইংরেজি আটের (8) মতো। মৌমাছি এই নাচ বা Waggle dance আন্দাজে করছে তা নয়। এই নাচের মাধ্যমে এক মৌমাছি অন্য মৌমাছিদের খাবারের উৎসের দূরত্ব সম্বন্ধে দিক-নির্দেশনা দেয়। কীভাবে নাচবে, কখন নাচবে, কোন গতিতে নাচবে, কীভাবে ঘুরবে—এর মাধ্যমে সে জানিয়ে দেয় কোথায় যেতে হবে, কী পরিমাণ দূরত্ব, কীভাবে যেতে হবে ইত্যাদি। কত দূর যেতে হবে তার ওপর নির্ভর করে মৌমাছি কোন গতিতে ওয়েগ্যাল ডান্স করবে। আর কোন দিকে যাবে সেটা বোঝানোর জন্যে সূর্য কত ডিগ্রি কোণে আছে সেই কোণ অনুযায়ী ধীর গতিতে নাচে তারা।
পৃথিবীতে আজ যদি কোনো মৌমাছি না থাকে তাহলে পরাগায়ন হবে না। ফলে কোনো খাদ্য উৎপন্ন হবে না। আমরা যত ধরনের খাবার খেয়ে বেঁচে থাকি যেমন, চাল ডাল গম কলা আম ইত্যাদি সবকিছুই উৎপন্ন হচ্ছে মৌমাছির ঐ নাচের জন্যে। মৌমাছি যদি না থাকত তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে সব খাবার শেষ হয়ে যেত। মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেত।
মৌমাছির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তার জীবনকাল কয়েকদিন হোক অথবা কয়েক সপ্তাহ, সে তার জীবনের লক্ষ্য জানে। তাই লক্ষ্য অর্জনের জন্যে দূরের পথ পাড়ি দিতেও সে দ্বিধা করে না। আর কাজ সম্পন্ন না করে মৌমাছি কখনো বিশ্রামও করে না। এখানেই একজন বিশ্বাসীর সাথে মৌমাছির সাযুজ্য রয়েছে। জীবনে যত বাধা আসুক না কেন একজন বিশ্বাসী মানুষও তার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ছিল জানুয়ারি ২০২৬-এ প্রকাশিত ‘যে শুরুর শেষ নেই’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান। এ আয়োজনে অতিথি হিসেবে ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসাবিজ্ঞানী, সায়েবা’স মেথডের উদ্ভাবক ও বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. সায়েবা আক্তার এবং শিক্ষাবিদ ও বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ।
‘যে শুরুর শেষ নেই’ বইটি প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কার, জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে ভারত উপমহাদেশের অবদান ও বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস উঠে এসেছে প্রফেসর ড. আতাউল করিমের এ বইতে। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি চারপাশের সবকিছু কৌতূহল নিয়ে দেখেছেন, পড়েছেন, বোঝার চেষ্টা করেছেন এবং লেখনীর মধ্য দিয়ে অন্যের কাছে সেই জ্ঞান পৌঁছে দিয়েছেন—এ বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি অভিভূত করেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার এ বইটি প্রকাশ করার জন্যে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানান।
অতিথির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি :
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আতাউল করিম
তার জন্ম ১৯৫৩ সালে, সিলেটের মৌলভীবাজার জেলায়। তার বাবা বাংলাদেশে ধূমপানবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ডা. মুহাম্মদ আবদুশ শুকুর। মা আনোয়ারা নূরী শুকুর। মায়ের কাছে তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি রেখেছেন অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর। ১৯৬৯ সালে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিকে মেধাতালিকায় চতুর্থ এবং ১৯৭২ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করার পর যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান ও তড়িৎ প্রকৌশল বিষয়ে তিনি স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ড. আতাউল করিমের কর্মজীবন বহুমুখী সাফল্যে বর্ণাঢ্য। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ডার্টমাউথ-এর ইলেকট্রিক্যাল এন্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। ২০২০ সাল পর্যন্ত একাধারে ৯ বছর তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভোস্ট, এক্সিকিউটিভ ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) এবং চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ওল্ড ডমিনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বিষয়ক উপ-প্রধান, সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিন, টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল এবং কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান, ওহাইয়ো-র ডেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল এবং কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান এবং ইলেক্ট্রো-অপটিক্স বিভাগের ফাউন্ডার-ডিরেক্টর হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
অপটিক্যাল সিস্টেম, অপটিক্যাল কম্পিউটিং এবং প্যাটার্ন রিকগনিশন জগতে সার্থক পদচারণার জন্যে তার নাম বিশ্বের শীর্ষ ৫০ জন বিজ্ঞানী-গবেষকের তালিকায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অ্যাপ্লাইড অপটিক্সের জগতে গত অর্ধশতাব্দীর ইতিহাসেও তার অবদান সর্বস্বীকৃত।
বিজ্ঞানের আলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে বিজ্ঞানী মোহাম্মদ করিম এপর্যন্ত ১৯টি বই রচনা ও সম্পাদনা করেছেন, যা পৃথিবীর প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পঠিত হচ্ছে পাঠ্যবই হিসেবে। তার মৌলিক গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা ৩৬৫টিরও বেশি এবং ৩টি ইউএস প্যাটেন্ট রয়েছে বাংলাদেশি এ বিজ্ঞানীর নামে। উল্লেখ্য, ছাত্রজীবন থেকেই তিনি লেখালেখির সাথে যুক্ত। বিজ্ঞান সাময়িকী ও বাংলা একাডেমির বিজ্ঞান পত্রিকায় ছাত্রাবস্থাতেই প্রকাশিত হয় তার ৩০টিরও বেশি লেখা।
প্রফেসর আতাউল করিমের জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নানা দেশের মেধাবী তরুণদের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা। একজন বাংলাদেশি হিসেবে তিনি এদেশের শিক্ষার্থীদের সবসময়ই উৎসাহ-অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছেন, দিয়ে যাচ্ছেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও উদ্দীপনা।
প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল দীর্ঘ প্রবাস-জীবন সত্ত্বেও প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে সর্বক্ষণ মনেপ্রাণে ধারণ করে আছেন ড. করিম—যার প্রমাণ মেলে তার চিন্তায়, কর্মে, জীবনদর্শনে। নর্থ আমেরিকান বাংলাদেশি ইসলামিক কমিউনিটি (নাবিক)-এর বোর্ড অব রিজেন্টসের তিনি প্রেসিডেন্ট। উল্লেখ্য, এ সংস্থার অর্থায়নে ও সহযোগিতায় বাংলাদেশে বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুনর্বাসন ক্ষেত্রে পরিচালিত হচ্ছে ২৫টিরও বেশি সেবা-কার্যক্রম।
বিজ্ঞানচর্চার সাথে সাথে ধর্ম এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়েও প্রফেসর আতাউল করিমের পড়াশোনা ও কাজের পরিধি ব্যাপক। ইসলামিক সোসাইটি সাউদার্ন ম্যাসাচুসেটস মসজিদে প্রতি মাসে একবার জুমার খুৎবা দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে তিনি ভার্জিনিয়া কোয়ালিশন ফর কমিউনিটি এন্ড জাস্টিস, নিউইয়র্কের সেন্টার ফর ক্রিশ্চিয়ান, জিউস এন্ড মুসলিম আন্ডারস্ট্যান্ডিং এবং ব্রংক্সের আভিসিনা একাডেমি, ওহাইয়ো-র ইসলামিক কাউন্সিল অব ওহাইয়ো এবং ন্যাশনাল কনফারেন্স অব ক্রিশ্চিয়ান এন্ড জিউস এবং টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ইসলামিক এডুকেশন ফাউন্ডেশন অব নক্সভিল-এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও ডেটন ইসলামিক স্কুলের প্রিন্সিপাল হিসেবেও টানা ৮ বছর দায়িত্ব পালন করেন মোহাম্মদ আতাউল করিম।
পদার্থবিজ্ঞানের একাধিক শাখায় উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আতাউল করিম নানা গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননায় ভূষিত হন। এর মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড সায়েন্স ফাউন্ডেশন অব ডেটন প্রদত্ত আউটস্ট্যান্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড ও আউটস্ট্যান্ডিং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড, নাসা টেক ব্রিফ অ্যাওয়ার্ড উল্লেখযোগ্য। অসামান্য মেধা ও কর্মপরিকল্পনার জন্যে তিনি ‘আমেরিকান ম্যান এন্ড ওম্যান ইন সায়েন্স’, ‘হু’জ হু ইন সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’, ‘আউটস্ট্যান্ডিং পিপল ইন টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরি’, এবং ‘টু থাউজেন্ড আউটস্ট্যান্ডিং সায়েন্টিস্টস’-এর তালিকাভুক্ত।
