কর্মজীবনে সফলতা শুধু দক্ষতা বা শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে না—এর চেয়েও বড় বিষয় হলো কর্মক্ষেত্রের আচার-আচরণ, শৃঙ্খলা ও মানসিকতা। একজন আদর্শ কর্মী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে চাইলে নিচের সূত্রগুলো মেনে চলুন।
শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব
১. কর্মী হিসেবে কাজে শৃঙ্খলা, সততা ও নিষ্ঠা বজায় রাখুন। নতুন ধারণা ও পরিকল্পনা দিয়ে কাজের মাত্রায় নতুনত্ব আনুন। তাহলে আপনার ওপর প্রতিষ্ঠান ভরসা করতে শুরু করবে এবং আপনি বড় দায়িত্ব পাবেন।
২. দ্রুত অর্থ উপার্জনকে পেশার লক্ষ্য বানাবেন না। এ লোভ আপনার বিনাশের কারণ হবে। — বসের প্রতি দায়িত্ব ও আনুগত্য
৩. বসের প্রতি আন্তরিক আনুগত্য প্রদর্শন করুন। কাজের ক্ষেত্রে বসের সিদ্ধান্তই সঠিক—এ নীতি অবলম্বন করুন।
৪. অফিসের ভেতরে ও বাইরে বসের সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকুন।
৫. লিডার/বসের প্রতি কোনো ক্ষোভ রাখবেন না। মনে ক্ষোভ থাকলে বাস্তবেও দূরত্ব বেড়ে যাবে।
৬. বসের অতিরিক্ত তোষামোদি না করে বাস্তবসম্মত প্রশংসা করুন। যে-কোনো আনুকূল্যের জন্যে তাকে ধন্যবাদ দিন।
নিজের প্রতি দায়িত্ব
৭. নিজের কাজ ও দায়িত্বের প্রতি বিশ্বস্ত ও আন্তরিক থাকুন। কারণ এ-কাজই আপনার রিজিক নিয়ে আসে।
৮. “আপনিই সবচেয়ে ভালো কাজ পারেন”—কথা ও আচরণে এ ধরনের মনোভাব প্রকাশ করবেন না।
৯. নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে যেন অন্যদের ক্ষতি না হয়, সে ব্যাপারে সচেতন হোন।
১০. নিজের ব্যর্থতাকে স্বীকার করে নিন। অধস্তনদের সামনে কোনো ব্যর্থতায় অজুহাত দেখাবেন না। এতে তারাও অজুহাত দিতে অভ্যস্ত হবে।
সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক
১১. সহকর্মীদের যে-কোনো যুক্তিসঙ্গত পরামর্শ ও সমালোচনাকে স্বাগত জানান।
১২. কারো প্রতি অন্যায় হয়ে গেলে নির্দ্বিধায় মাফ চেয়ে নিন।
১৩. সহকর্মী/অধস্তন/পিয়ন—কাউকে দিয়ে কোনো কাজ করানোর ক্ষেত্রে আদেশ নয়, অনুরোধের সুরে ও বিনীত ভাষায় বলুন।
১৪. সহকর্মী/অধীনস্থ কেউ ভুল করে ফেললে সবার সামনে তিরস্কার না করে আলাদাভাবে বলে তাকে শুধরে নেয়ার সুযোগ দিন।
১৫. কোনো সহকর্মী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রুমে গেলে এ নিয়ে নিজেরা কোনো অনুমাননির্ভর আলাপ করবেন না। তিনি ফিরে এলে কী কথা হয়েছে, অতি উৎসাহী হয়ে তা জানতেও চাইবেন না।
১৬. কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করার আগে সে-বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন।
১৭. কারো কাছ থেকে আর্থিক হিসাব পুরোপুরি বুঝে নেয়ার পর কোনো গরমিল ধরা পড়লে তার দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করুন।
১৮. বসের প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্যে সারাক্ষণ অন্যের দোষ ধরার চেষ্টায় লিপ্ত হবেন না।
গোপনীয়তা ও বিবেচনা
১৯. আপনার কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, এমন কোনো বিষয়ে সহকর্মীর ভুল দৃষ্টিগোচর হলে তাকে সমমর্মিতার সাথে জানান। আগ বাড়িয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন না। সাময়িক প্রশংসা/গ্রহণযোগ্যতা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে এই মানসিকতা আপনার জন্যে কল্যাণকর নয়।
২০. একটি কাজ বা দায়িত্বের সাথে যিনি বা যারা সংশ্লিষ্ট তাদের ছাড়া অন্যদের সঙ্গে সে-বিষয়ে আলাপ করা থেকে বিরত থাকুন।
২১. অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতায় পিছিয়ে থাকা সহকর্মীর প্রতি অভিযোগপ্রবণ না হয়ে তাকে সহযোগিতা করুন।
২২. অধীনস্থ/সহকর্মীদের কাজে সন্তুষ্ট না হলেও প্রকাশ্যে বিরূপ মন্তব্য করবেন না। নেতিবাচক চিন্তা ও কথা আপনার সাফল্যকে বিঘ্নিত করবে।
২৩. আপনার কোনো ভুলের প্রেক্ষিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরূপ মন্তব্য নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা বা সমালোচনা করবেন না। তাতে আপনি নিজেকেই অসম্মানিত করবেন।
অভিনন্দন ও সমালোচনা
২৪. সহকর্মীর সাফল্য বা পদোন্নতিতে ‘খাওয়াতে হবে’ বলে জোর করবেন না।
২৫. কারো ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রথম সুযোগেই অভিনন্দন জানান।
২৬. সহকর্মীকে তার ভুলের জন্যে অন্য কারো সামনে ভৎর্সনা/অপদস্থ/নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকুন। যাদের জানার প্রয়োজন নেই তাদের সাথে এ বিষয়ে আলাপও করবেন না।
২৭. কেউ আপনার ভুল ধরিয়ে দিলে রাগান্বিত/বিরক্ত হবেন না। হতে পারে আপনার ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আন্তরিকতা থেকেই তিনি তা জানিয়েছেন।
২৮. আপনার যে-কোনো সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে নিন এবং সেখান থেকে শিক্ষণীয় বিষয়টি খুঁজে বের করুন।
কর্মক্ষেত্রের নীতি ও পরিবেশ
২৯. প্রতিষ্ঠানের অপ্রয়োজনীয় নথিপত্র সের দরে বিক্রি না করে টুকরো করে পানিতে ভিজিয়ে তারপর ডাস্টবিনে ফেলে দিন। আগুনে পোড়াবেন না।
৩০. প্রশান্ত মনে, ঠান্ডা মাথায় সম্ভাব্য সবদিক বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিন। প্রয়োজনে নিরিবিলিতে কিছুক্ষণ ধ্যান/মেডিটেশন করুন।
৩১. বর্তমান ও পুরনো সহকর্মীদের মাঝে মাঝে খোঁজ নিন। যোগাযোগ রাখুন, সংযোগায়ন করুন।
৩২. সম্ভাব্য ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ/উপদেশ এবং সহকর্মীদের পরামর্শ আপনার কাজকে সমৃদ্ধ করবে।
৩৩. ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে কখনো কারো প্রতি আচরণে তারতম্য করবেন না।
৩৪. বাইরে অফিসিয়াল কোনো কাজ না থাকলে অফিসে প্রবেশের ও অফিস থেকে বের হওয়ার নির্দিষ্ট সময় অনুসরণ করুন।
মনোবল ও উন্নয়ন
৩৫. কেউ ভুল করলে/হীনম্মন্যতায় ভুগলে তার গুণাবলি ও আগের ভালো পারফরমেন্সের কথা স্মরণ করিয়ে দিন। চেষ্টা করতে বলুন ভবিষ্যতে আরো ভালো করার জন্যে।
৩৬. দায়িত্ব হস্তান্তর বা পরিবর্তন হলে/ট্রান্সফার হলে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করুন। শাস্তিস্বরূপ বা পক্ষপাতিত্বের কারণে এটি করা হয়েছে—এমন ভাববেন না। পরিবর্তনকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ মনে করুন।
৩৭. সঠিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার জন্যে প্রত্যক্ষ উৎস বা মূল দায়িত্বশীলের সাথে যোগাযোগ করুন।
৩৮. প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে আপনার দায়িত্ব/কাজ যে সহকর্মীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করবেন না। তিনি সাহায্য চাইলে সাধ্যমতো সহযোগিতা করুন। কিন্তু মনে রাখুন, নাক গলানো ও সহযোগিতা এক নয়।
সচেতনতা ও শ্রদ্ধাবোধ
৩৯. কারো ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, গোত্রীয়, আঞ্চলিক, জাতিগত অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কোনো বক্তব্য বা কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।
৪০. ফোনে কথা বলার শুরুতেই বা দেখা হওয়া মাত্রই কাজের কথা বা কোনো ভুলের কথা উল্লেখ করবেন না। শুরুতে কুশল বিনিময় করুন, তারপর কাজের কথা বলুন।
৪১. যে-কারো কাছ থেকেই শেখার সুযোগ নিন। না-জানা অপরাধ নয়। কিন্তু জানতে না চাওয়া বোকামি এবং এ প্রবণতা হীনম্মন্যতা বাড়ায়।
শেষ কথা
পেশাজীবন দীর্ঘ পথচলা। এ পথে সাফল্য আসে ধৈর্য, বুদ্ধিমত্তা ও মানবিকতার সমন্বয়ে। উপরোক্ত সূত্রগুলো যদি প্রতিটি কর্মী আন্তরিকভাবে অনুসরণ করেন, তবে যেমন ব্যক্তিগত জীবন হবে সমৃদ্ধ, তেমনি প্রতিষ্ঠানও পাবে একজন আদর্শ কর্মী। আর এটাই হলো প্রকৃত সাফল্য।
“কাজই আপনার রিজিক নিয়ে আসে—তাই কাজকে ভালোবাসুন, সহকর্মীকে সম্মান করুন, আর সাফল্য আপনাকে খুঁজে নেবে।”
লেখক: কবির আহমেদ
সম্পাদক, আর এমজিবিডি নিউজ ২৪কম
