নাকি দরকার ‘আত্মসম্মান’ ও ‘প্রজ্ঞা’র ক্ষুধা জাগানো
ক্ষুধা তো মানুষকে আরও লোভী করে, লোভের চারাগাছ থেকেই জন্ম নেয় অনিয়ম আর দুর্নীতির বিষবৃক্ষ; তাহলে ক্ষুধা কীভাবে দুর্নীতি মুক্তির হাতিয়ার হতে পারে?
অনেক দেশেই এখন দুর্নীতির মহোৎসব চলছে। চাকরি পাওয়ার জন্য ঘুষ, পোস্টিং নেওয়ার জন্য তদবির, পোস্টিং বদলের জন্য ঘুষ, প্রমোশন পাওয়ার জন্য আবার কেউবা অন্য কারো পদোন্নতি আটকানোর জন্য ঘুষ দিচ্ছে; ব্যবসা পাওয়া কিংবা অন্যের ব্যবসা আটকানোর জন্য ঘুষ দেওয়া-নেওয়া; কোন কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আজকাল নাকি ভোট দেয়ার জন্যও অর্থ নেয়া হয়। বাস্তবে ঘুষ, দুর্নীতি, উৎকোচ, কমিশন, স্পিড মানি ও তদবির যেন আধুনিক যুগের চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। রাজনীতি থেকে ব্যবসা, শিক্ষা থেকে সমাজকল্যাণ, সবখানেই যেন দুর্নীতির প্রতিযোগিতা শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুর্নীতি আসলে কী? কোনটিকে আমরা নীতি এবং কোনটিকে দুর্নীতি বলে চিহ্নিত করি? কোনটি ন্যায় আর কোনটি অন্যায়?
আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এথেন্সের রাস্তায় সক্রেটিস ঠিক এই প্রশ্নটিই করতেন। তিনি জ্ঞানীদের কাছে জানতে চাইতেন, ন্যায় বলতে আসলে কী বোঝায়? মানুষেরা উত্তর দিত, ‘আইন মেনে চলাই ন্যায়।’ তখন তিনি পাল্টা প্রশ্ন করতেন, ‘আইন নিজেই যদি একটি অন্যায় আইন হয়, তবে সেই আইন মেনে চলা কি ন্যায় হবে?’
শত শত বছর ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে, কিন্তু চূড়ান্ত কোনো সমাধান আজও মেলেনি। কিন্তু প্রশ্ন থেমে নেই, আজও আমরা একই প্রশ্ন করছি; নীতি আর দুর্নীতি কিসের ভিত্তিতে পরিমাপ হয়?
একজন অফিসার যখন কোনো বিশেষ কাজের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা বা কমিশন দাবি করেন, সেটা দুর্নীতি। কিন্তু একজন ক্ষুধার্ত মানুষ যখন খাবার চুরি করে, সেটা কি অন্যায়?
অডিট অফিস যখন সকল ক্লায়েন্টের জন্য বিলের ১% দাবি করে এবং ক্লায়েন্টরা নিয়মিতভাবে সেই ১% দিয়ে তাদের বিলগুলো মুক্ত করেন, সেটি কি দুর্নীতি?
ঠিকাদার যখন যেনতেন ভাবে কাজ শেষ করে বিল তুলে নেন কিংবা রাস্তা, ব্রিজ কিংবা টানেল নির্মাণের প্রকৃত খরচকে কয়েকগুন বেশি এস্টিমেট করেন কোন সরকারী দপ্তর, সেটা কি অন্যায়?
যখন একজন সুস্থ্য সবল মানুষ মহাসড়কে ভিক্ষা করেন কিংবা কেউ একজন পারিশ্রমিক পাওয়ার পর আবার বকশিশ দাবী করেন, সেটা কি দুর্নীতি?
যখন একজন চিকিৎসক প্রতি ৫ মিনিটে একজন কিংবা দিনে ২০০ জন রোগীর জীবন মরণের চিকিৎসাপত্র লিখে দেন তবে তিনি কি সত্যিই ন্যায় করছেন?
ব্যাংক যখন মানুষকে ১ শতাংশ সুদে টাকা ধার দেয়, সেটা সুদ কিন্তু একজন ব্যবসায়ী যখন ৫০০% লাভ যুক্ত করে পন্য বিক্রি করেন সেটা কি অন্যায়?
সমাজে অসংখ্য মানুষ ক্ষুধার্ত অথচ কেউ কেউ খাসির কাবাব আর বিরিয়ানী দিয়ে উৎসব করছেন, এটা কি ন্যায় নাকি দুর্নীতি?
বস্তির শিশুটি কাদামাখা ঘরে ছেঁড়া কাপড়ের মাঝে কনকনে শীতে, অথচ তারই পাশে ১৪ তলা বিল্ডিংয়ে ধনীর শিশুটি আরামে নিরাপত্তায়, এটি কি বস্তির শিশুর প্রতি ন্যায় নাকি অন্যায়?
ন্যায় আর অন্যায়, নীতি আর দুর্নীতি নিয়ে এমন হাজার হাজার প্রশ্ন করা যাবে, কিন্তু সেসবের সঠিক জবাব কোনো কিতাবে পাওয়া যাবে না। কেউ কেউ হয়ত উত্তর দিতে এগিয়ে আসবেন কিন্তু সেসব জবাব হবে ‘যার জবাব তার মতো’। আসলে ন্যায়-অন্যায় আর নীতি-দুর্নীতির এমন প্রশ্নের উত্তর কোনো বই, কিতাব, বক্তৃতা কিংবা গবেষণাগারে নেই, আছে কেবল প্রতিটি প্রজ্ঞাবান মানুষের অন্তরে। একজন প্রজ্ঞাবান আত্মসম্মানী মানুষই কেবল আপন অন্তরে সঠিক নৈতিকতার সংজ্ঞা খুঁজে পান, তাই নীতি আর দুর্নীতি অত্যন্ত গভীরভাবে মানুষের প্রজ্ঞার মানদণ্ডের সাথেই জড়িত।
মানুষ ন্যায় পরায়ণ হবে নাকি কেউ অন্যায়ের মাঝে জীবন কাটাবে, এই যে ভিন্ন ভিন্ন পথে চলার মোটিভেশন, এই মোটিভেশনের উৎস আসলে কোথায়?
মানুষের প্রতিটি আচরণের পেছনে যে মানসিক শক্তি, তার বহু উৎস রয়েছে, তবে এর মধ্যে অন্যতম মজবুত শক্তির উৎস হলো ধর্মীয় বিশ্বাস। ধর্মীয় বিশ্বাস সত্যিই মানুষের অন্তরকে অত্যন্ত গভীরভাবে মোটিভেটেড রাখে। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে, বাস্তব জগতে আমরা প্রায়ই দেখি, অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ প্রতিদিন তাদের সেই বিশ্বাসের লঙ্ঘন করে জীবন যাপন করছেন। দেখা যায়, গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী হয়েও কেউ কেউ ঘুষ আর দুর্নীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। তাহলে এটা স্পষ্ট যে ধর্মবিশ্বাস থাকলেই কেউ ঘুষ আর দুর্নীতিমুক্ত থাকবেন, সে দাবি করা যায় না।
এবার ধরুন জ্ঞানের কথা; একজন মানুষ যার সঠিক জ্ঞান আছে, যিনি ঘুষ আর দুর্নীতিকে অত্যন্ত খারাপ বলে জানেন, এমন মানুষ কি সবসময় ঘুষ-দুর্নীতি থেকে বিরত থাকেন? না, জগতে এমন অনেক বড় বড় ডিগ্রীধারী জ্ঞানী মানুষ আছেন যারা প্রতিদিন তাদের ন্যায়-অন্যায়ের জ্ঞানকে উপেক্ষা করে জীবন যাপন করে চলেছেন।
আইন আর নিয়ম কি মানুষকে দুর্নীতি থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম? না, সেটা যে সম্ভব নয় তার প্রমাণ চারিদিকেই স্পষ্ট। প্রতিটি রাষ্ট্রেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর আইন, নিয়ম আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আছে, তবুও অধিকাংশ রাষ্ট্র ব্যবস্থা দুর্নীতি থেকে মুক্ত নয়।
এবার চলুন দেখে নিই আত্মসম্মানবোধের শক্তি কীভাবে মানুষকে অন্তরের গভীর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। আত্মসম্মানবোধ হলো আত্মপরিচয়ের অংশ; যখন মানুষেরা কোনো আচরণকে তাদের আত্মপরিচয়ের অংশ বলে অনুভব করতে অভ্যস্ত হয়, তখন সেই আচরণকে তারা ভালোবাসতে শুরু করে। এই ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয় এমন এক মানসিক শক্তি যে তারা আর সেই আচরণকে কখনোই ছাড়তে পারে না; এমনকি ধীরে ধীরে সেই আত্মপরিচয় রক্ষার তাগিদ মানুষের অন্তরে এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে তারা তাদের সেই আত্মপরিচয়ের সাথে যুক্ত আচরণকে জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করতে এগিয়ে আসে।
আত্মপরিচয়ের শক্তিই আত্মসম্মানের শক্তি, যা মানুষকে অত্যন্ত কঠোরভাবে ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। পাশ্চাত্যের কোনো কোনো সমাজের নারীরা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও খোলামেলা পোশাকে চলাফেরা করাকে স্বাধীনতার আত্মপরিচয় বলে মনে করতে অভ্যস্ত হয়েছেন, তাই হিজাব পরিধান করা কিংবা মাথার চুল ঢেকে রাখাকে তারা অসম্মানিত বলে অনুভব করেন।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশে, যেখানে নারীরা হিজাব পরিধান করতে অভ্যস্ত হয়েছেন, তাঁরা সেই হিজাব পরিহিত পোশাককেই শালীন, সম্মানজনক ও স্বাধীনতা বলে বিশ্বাস করেন; এই নারীরা কখনোই স্বল্প পোশাকে বাইরে চলাফেরা করা কিংবা মাথার কাপড় না থাকার কথা ভাবতেও পারেন না। এই যে মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য, এটিই সেই আত্মপরিচয়ের পার্থক্য।
এটা স্পষ্ট যে, এই আত্মপরিচয় অত্যন্ত শক্তিশালী মানসিক ক্যাপিটাল, অথচ এটা সম্পূর্ণভাবেই সামাজিক পরিবেশের সৃষ্টি। মানুষ তার আত্মপরিচয়ের এই গঠনে নিজেকে যখন একজন রাজা হিসেবে বা একজন বিলিয়নার হিসেবে দেখে, তখন তার আচরণে রাজত্ব আয়ত্ত করা, কিংবা সম্পদের পাহাড় সৃষ্টির মোটিভেশন সবচেয়ে তীব্র হয়।
পক্ষান্তরে একজন মানুষ যখন তার সামাজিক পরিবেশ থেকে শিখে নিতে অভ্যস্ত হয় যে, ‘আমি একজন ন্যায়পরায়ণ মানুষ, আমি একজন সহমর্মী ব্যক্তি, আমি একজন দায়িত্ববান ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মানুষ’ তখন তিনি সব ধরণের অন্যায় ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত থাকার সর্বোচ্চ মানসিক শক্তি অর্জন করেন। এমন মানুষেরা ক্ষুধার্ত থাকলেও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন না, অর্থ-সম্পদের লোভ তাদেরকে অন্যায় পথে টানতে পারে না; এমন মানুষের হাতেই রক্ষা পায় জনগণের অধিকার। এটাই আত্মসম্মানবোধের শক্তিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল।
একজন আত্মসম্মানী মানুষ তার প্রজ্ঞার মানদণ্ডে যা কিছুকে ন্যায় বলে জানেন, তা জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করেন; এমন মানুষ কখনোই অন্যায় আইন বা নিয়ম তৈরি করেন না। ঘুষ, তদবির ও স্বজনপ্রীতি থেকে দূরে থেকে তিনিই মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে যখন কোনো ব্যক্তি ‘বিশুদ্ধ সততা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা’ এই চারটি নিয়ামককে নিজের আত্মসম্মান বলে অনুভব করতে অভ্যস্ত হন, তিনিই হয়ে ওঠেন নৈতিকতার প্রকৃত রক্ষক এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য শক্তি।
মানুষ কিসে সম্মান বা অসম্মান বোধ করবে, তার কোনো স্থায়ী গাণিতিক সংজ্ঞা নেই। সমাজে যা কিছুকে ‘সাকসেস প্যারামিটার’ হিসেবে কোড করা হয়, মানুষ সেটিতেই সম্মান খোঁজে। সমাজ যখন মেধা ও সততাকে বাদ দিয়ে অবৈধ বিত্তবৈভব ও ক্ষমতার প্রদর্শনকে সম্মান জানাতে শুরু করে, তখন জন্ম নেয় দুর্নীতির অন্তহীন ক্ষুধা। মানুষ তখন পেটের দায়ে নয়, বরং সামাজিক স্ট্যাটাস ও বিকৃত মর্যাদার ক্ষুধা মেটানোর জন্যই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। এই যুগে অনেক রাষ্ট্রেই মানুষের নৈতিক মেরুদণ্ড আজ ভেঙে পড়ার উপক্রম। কোনো আইন, শাস্তির ভয় বা বলপ্রয়োগ দিয়ে এই পতন রোখা সম্ভব নয়, যদি না অন্তরের ভেতরের ‘ক্ষুধা’র স্বরূপটির রূপান্তর সম্ভব হয়; আর সেই রূপান্তরের মূলে রয়েছে ‘আত্মসম্মানবোধের ক্ষুধা’।
পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে ন্যায়-অন্যায়ের ব্যাখ্যা কিংবা আইন ও পুলিশ দিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা অসম্ভব, তাই এর ভিত্তি হওয়া উচিত প্রজ্ঞার মানদণ্ড যা বিশুদ্ধ সততা, দায়িত্ববোধ, প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও সহমর্মিতা। প্রজ্ঞার এই মানদণ্ডে নির্ণীত আত্মসম্মানবোধকে জনগণের ‘ক্ষুধা’য় রূপান্তর করতে পারলেই কেবল সত্যিকার অর্থে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
তবে এই আইডিয়া বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যবস্থায় অগ্রাধিকারে আত্মসম্মানবোধের চর্চাকে সামাজিক আন্দোলনে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। স্কুলের পাঠ্যবই, শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি, শিল্পী, লেখক ও সামাজিক মাধ্যমের প্রতিটি পোস্ট যেন আত্মসম্মানবোধের চাষাবাদের লক্ষ্যে সচল হয়, সেজন্য একটি গণজাগরণ সৃষ্টি করা দরকার। কারো দিকে তাকিয়ে না থেকে প্রতিটি নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে। নিশ্চিতভাবেই এটি রকেট সায়েন্সের মতো জটিল কিছু নয়, অথচ এর ফলাফল যুগান্তকারী। প্রজ্ঞার মানদণ্ডে আত্মসম্মানবোধের চর্চাই রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে, জীবন ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং নাগরিক ভ্রাতৃত্ববোধকে করবে শক্তিশালী। এটিই হবে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উন্নয়ন।
এ ইউ দৌলা
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)
